ঢাকা: বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। তাদের মধ্যে সৌজন্য বৈঠকও হয়।
কূটনৈতিক টানাপাড়েনের মধ্যে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য জয়শঙ্কর ঢাকায় এলেও তার এ সফর ঘিরে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি কোনো বিশেষ বার্তা দিয়ে গেছেন কি না তা নিয়েও দেখা দিয়েছে কৌতূহল।
জানা গেছে, ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার সফরে তিন উপদেষ্টার সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন জয়শঙ্কর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লির মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে তিক্ততা ও টানাপোড়েন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া, তার দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাকে আশ্রয় দেওয়া, যারা বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত, বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাসহ তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের বাংলাদেশের হাতে তুলে না দেওয়া, দেশ অস্থিতিশীল করতে অনলাইনে হাসিনার হুমকি-উস্কানি বন্ধ করার আহ্বানে সাড়া না দেওয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া ন্যারেটিভ ছড়ানো, এ নিয়ে সে দেশের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে মিথ্যাচার ছড়ানো, ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এসব কারণে ডিসেম্বরেও উভয় দেশের হাইকমিশনারকে দু’দফায় তলব ও পালটা তলবের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যেই খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা নিয়ে ঢাকায় আসতে হয় জয়শঙ্করকে।
সূত্র বলছে, শোক প্রকাশ করতে এলেও আগামী নির্বাচন ঘিরে বেশকিছু বার্তাও দিয়ে গেছেন তিনি। দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর গভীর সম্পর্ক চায় দেশটি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে ভারত প্রত্যাশা করে।
ঢাকা সফর নিয়ে জয়শঙ্করের বার্তা:
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরের দিনেই এক বার্তায় বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, বেগম খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ আমাদের অংশীদারিত্বের উন্নয়নে দিকনির্দেশ করবে।’
ঢাকা সফরের পর ২ জানুয়ারি ভারতের চেন্নাইতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এস জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমি দুদিন আগে সেখানে (ঢাকায়) গিয়েছিলাম। আমি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) শেষ শ্রদ্ধায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়েছিলাম। তবে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
নির্বাচন নিয়েও আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি থিতু হলে এ অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতায় বিশ্বাসী। ভারতের দুই ধরনের প্রতিবেশী আছে– ভালো ও মন্দ। বেশিরভাগ প্রতিবেশীই মনে করে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলে তাদেরও প্রবৃদ্ধি হবে। ভারতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তারাও উন্নত হবে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পুরো বিশ্বকে একটি পরিবার হিসেবে মনে করে। ভারত শক্তি ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করে। আর এ বার্তাই আমি বাংলাদেশে দিয়ে এসেছি।’
জয়শঙ্করের সফরকে যেভাবে দেখছে ঢাকা:
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে রাজি নয় ঢাকা। জয়শঙ্করের সফরের পরদিন ১ জানুয়ারি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফর আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখাই উচিৎ হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে খালেদা জিয়ার পজেটিভ ইমেজ আছে। তিনি নিজেকে একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। এ অঞ্চলের সব মানুষের কাছেই তার এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা আছে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার সবাই স্বীকারও করেন। সে কারণে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে সবাই অংশগ্রহণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা ইতিবাচক শিষ্টাচার, আমি সেভাবেই দেখি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীও সেজন্য এসেছিলেন। তিনি খুব সংক্ষিপ্ত সফর করে চলেও গেছেন। শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে বেশি উত্তর না খুঁজতে যাওয়াই ভালো।
ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কি টানাপোড়েন কমবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর জয়শঙ্করের এই সফর ছিল প্রথম কোনো ভারতীয় মন্ত্রীর ঢাকা সফর। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন কমবে কি না। ঠিক এই প্রশ্নটাই রাখা হয়েছিলো পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেনের কাছে। তিনি খুব কৌশলী উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটার উত্তর আপনাদের আগামীতে খুঁজতে হবে।’
এদিকে জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরদিন ১ জানুয়ারি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে উপস্থিত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য খোলা শোক বইতে শোক জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গেও আলাপ করেন তিনি। হাইকমিশনে উপস্থিত হয়ে ভারতের একজন শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীর শোক জানানোকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
তিন উপদেষ্টার সঙ্গে জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ:
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফরকালে তিন উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই তিন উপদেষ্টা হলেন- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে কী আলোচনা হয়েছে, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, জয়শঙ্করের সাথে আমার যে কথাবার্তা হয়েছে, সেখানে রাজনীতি ছিল না। সবার সামনেই আলাপ হয়েছে, সেখানে দ্বিপাক্ষিক কিছু ছিল না।
তারেক রহমানের প্রতি মোদীর বার্তা:
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া মোদীর চিঠিতে বার্তা দেওয়া হয়, আগামী দিনে বিএনপির নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী ভারত।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী চিঠিতে লিখেছেন, ‘২০১৫ সালের জুন মাসে ঢাকায় বেগম সাহিবার (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ও আলোচনার কথা আমি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে স্মরণ করি। তিনি ছিলেন সংকল্প ও আদর্শনিষ্ঠায় বিরল এক নেত্রী, যিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।’
‘তার প্রয়াণ এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করলেও তার আদর্শ ও উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আপনার যোগ্য নেতৃত্বে তার সেই আদর্শগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। একই সাথে তা এক নতুন পথচলা নিশ্চিত করতে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।’
বিশেষজ্ঞরা কী বলেছেন?
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকা সফরে কী বার্তা পাচ্ছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘শিগগিরই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে বিএনপি হয়তো ক্ষমতায় আসতে পারে, এমন ধারনা থেকেই হয়তো দলটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছে ভারত। এখন তাদের হাতে অন্য কোনো অপশনও নেই, বিএনপিই এই মুহূর্তে ভারতের নাম্বার ওয়ান অপশন। আগামী দিনে বাংলাদেশে যে নেতৃত্ব আসবে বলে তারা (ভারত) প্রত্যাশা করছে, তাদের প্রতি বার্তা দিয়ে গেছে। তারা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের সঙ্গে কাজ করতেই আগ্রহী।
উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অন্যান্য অনেক দেশের মতো ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
