।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্যের ভিত্তিতে দাঁড় করানোর দাবি বহুদিনের। বিশেষ করে ধর্মশিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ, বেতন–গ্রেড, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন নীতিমালায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকদের বিএড ছাড়াই ১১তম গ্রেড এবং হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড প্রদানের সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমাজে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন—এক দেশে একই শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় পার্থক্যের ভিত্তিতে ভিন্ন গ্রেড নির্ধারণ কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সমতার নীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের আলোকে বিষয়টি সত্যিই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা একটি অধিকার, এবং শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা। কিন্তু যখন একই ধরনের কাজ, একই পরিমাণ দায়িত্ব, একই ধরনের পাঠ্যক্রম পরিচালনার পরও একজন শিক্ষক বেশি গ্রেড পান এবং আরেকজন কম, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই ব্যবধানের ভিত্তি কোথায়?
ইসলাম শিক্ষা এবং হিন্দু ধর্ম শিক্ষা—উভয় বিভাগেই শিক্ষকরা পাঠদান করেন নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন ও জাতির মানবিক মূল্যবোধ গড়ার লক্ষ্যে। কাজের ধরন, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, পাঠ পরিকল্পনা, সহশিক্ষা কার্যক্রম—সবকিছুই প্রায় অভিন্ন।
তাহলে ধর্ম অনুসারে গ্রেড বিভাজন কোন যুক্তিতে? এটি কি একটি পেশাভিত্তিক না হয়ে ধর্মভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস? রাষ্ট্র যখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার অঙ্গীকার করে, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু চাকরি বা বেতনের বিষয় নয়—এটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তাকে প্রভাবিত করে।
ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বিষয়ের বহু শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন—“একই প্রতিষ্ঠানে একই কাজ করব, কিন্তু শুধু ধর্মের কারণে আমার গ্রেড কম হবে—এটি কোনওভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।”
তাদের মতে বিএড ছাড়াই হিন্দু শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড দেওয়া হলেও বিএড করে ইসলাম ধর্ম শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড—এই বৈপরীত্য আরও বেদনাদায়ক।
এমন একটি নীতিমালা শিক্ষকদের ভেতরে বিভাজন তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই করে না। একজন শিক্ষক কম গ্রেড পেলে তার কর্মস্পৃহা, আত্মসম্মান ও পেশাগত মর্যাদায় প্রভাব পড়ে—যা শেষমেশ ছাত্রদের শিক্ষার মানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দেয়। সেখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য বরদাস্ত করা হয় না। শিক্ষা নীতিতেও একই নীতি অনুসরণের কথা বলা আছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখলে দেখা যায়—নতুন এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের সেই মূল চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্র যদি সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দেয়,শিক্ষা ব্যবস্থা যদি সকল ছাত্রকে সমানভাবে মূল্যায়ন করে। তবে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ বা বেতন-গ্রেডে ধর্মভেদে পার্থক্য রাখার কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে না।
নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে অনেকে যুক্তি দেন—ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, তাই সেখানে শিক্ষক সংখ্যা এবং চাহিদাও বেশি। ফলে কোনও ধরনের জটিলতা বা শূন্যপদ অলস রাখার জন্য ১১তম গ্রেড দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই যুক্তির কয়েকটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে—শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে গ্রেড নির্ধারণ করা যায় না।গ্রেড নির্ধারণ হয় শিক্ষকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানদণ্ড দিয়ে। এমন যুক্তিও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।শিক্ষকতা বাজারচালিত নয়, এটি রাষ্ট্রচালিত একটি পেশা।
এই সীমাবদ্ধতা থেকেই প্রমাণ হয়—যে যুক্তিই দেওয়া হোক, গ্রেড বৈষম্যের পক্ষে কোনও শক্ত ভিত্তি নেই।
যে কোনও পেশাগত অসমতা শিক্ষকদের মনোবল নষ্ট করে, কিন্তু ধর্মভিত্তিক বৈষম্য আরও ভয়াবহ। কারণ—এটি ছাত্রদের মাঝেও ভুল বার্তা দেয় যে ধর্মভেদে মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে।শিক্ষকরা নিজেরাও নিজেদের সম্মানহানি অনুভব করতে পারেন।দীর্ঘমেয়াদে এটি ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বহু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, পাঠ্যবই বিতর্ক—এর মধ্যে নতুন করে ধর্মভিত্তিক বিভাজন তৈরি করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।এ পরিস্থিতিতে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে—একই যোগ্যতা ও একই দায়িত্বে একই গ্রেড নিশ্চিত করা।ধর্ম নির্বিশেষে সকল ধর্মশিক্ষা বিষয়ের শিক্ষককে সমান গ্রেড দিতে হবে। গ্রেড নির্ধারণ যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণভিত্তিক করতে হবে। বিএড বা সমমানের প্রশিক্ষণ থাকলে তা গ্রেড পাওয়ার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত।
নীতি তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করলে ভুল বোঝাবুঝি এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া কমে।নীতিমালা কেন এমন হলো—এর একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে।
শুধু কথায় নয়, বাস্তবে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যাতে কোনও সম্প্রদায় নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে না করে।
সংবিধানের আলোকে আমরা দেখতে পাই-ইসলামে ১১তম এবং হিন্দু ধর্মে ১০ম গ্রেড—যদি একই যোগ্যতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে হয়, তবে এটি সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৮(৩), এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসাবে গণ্য হতে পারে।
শিক্ষা ব্যবস্থা একটি দেশের নৈতিক ও মানবিক বোধের প্রতিচ্ছবি। সেখানে বৈষম্য থাকলে তা শুধু পেশাগত অসন্তুষ্টি নয়—রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত।
শিক্ষক নেতা জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিএড ছাড়া ইসলাম শিক্ষা ১১তম গ্রেড, আর হিন্দু ধর্ম শিক্ষা ১০ম গ্রেড—এটা কোন ন্যায়বিচার? শিক্ষা নীতিমালায় এ ধরনের ধর্মভিত্তিক বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য এবং সংবিধানবিরোধী।”
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব জসিম উদ্দিন আহমদ বলেন-বর্তমান সময়ে এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে ক্ষেত্র বিশেষ বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরকে আন্দোলন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। হিন্দু ধর্মের শিক্ষক বেতন পাবেন ১০ গ্রেডে আর ইসলাম ধর্মের শিক্ষক বেতন পাবেন ১১ তম গ্রেডে, এযেন এক তুঘলকি কান্ড। হিন্দু ধর্মের শিক্ষকগণ কম ছাত্র পড়ায়ে বেতন পাবেন বেশি আর ইসলাম ধর্মের শিক্ষকগণ বেশি ছাত্র পড়ায়ে বেতন পাবেন কম এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এ অবস্থা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ রইল বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করুন না হয় ইসলাম ধর্মের শিক্ষকগণ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
সাধারণ শিক্ষকরা মনে করছেন, ধর্মভিত্তিক গ্রেড বিভাজন ন্যায্য নয়। ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকরা অনুভব করছেন, তাদের পেশাগত মর্যাদা কমিয়ে দেখা হচ্ছে। একই দায়িত্ব ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন গ্রেড দেওয়া অন্যায় বলে তারা মনে করছেন।
শিক্ষকরা মনে করেন, শিক্ষক পেশায় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণই গ্রেড নির্ধারণের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত, ধর্ম নয়। তারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, এভাবে বিভাজন শিক্ষকের মনোবল ও একতা ক্ষুণ্ণ করবে এবং শিক্ষার মানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাধারণ শিক্ষকরা আশা করছেন, নীতিনির্ধারকরা তাদের প্রতিক্রিয়া শুনবেন এবং ধর্মনিরপেক্ষভাবে সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করবেন। অনেকেই মনে করেন, দেশের সাম্য ও ন্যায়ের স্বার্থে সমতা প্রতিষ্ঠা জরুরি এবং এই বৈষম্য দ্রুত দূর করা উচিত।
সমতা, ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার যে নীতি আমরা সংবিধানে ধারণ করি—নীতিমালায় তার প্রতিফলন থাকা জরুরি। রাষ্ট্র যদি সব ধর্মের প্রতি সমান মর্যাদা চায়, তবে সেই মর্যাদা শিক্ষক নিয়োগ ও গ্রেড নির্ধারণেও প্রতিফলিত হতে হবে।
এখন সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের—এই বিভাজনকে তারা বজায় রাখবেন, নাকি পেশাগত মর্যাদায় সমতার ভিত্তি পুনর্গঠন করবেন।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
