।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের সময় একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—ভোট কতটা নিরপেক্ষ হবে? প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে? এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক–কর্মচারীরা কতটা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবেন?
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) একটি প্রস্তাব তুলেছেন—এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রচারে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা। তাদের ভাষ্য, শিক্ষকরা যেহেতু নির্বাচনের দিন কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন, তাই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারে অংশ নেওয়া সুষ্ঠু ভোটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশ্ন হলো—ডিসিদের এই প্রস্তাব কতটা যৌক্তিক? এই প্রস্তাব কি সত্যিই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করতে সক্ষম হবে, নাকি এটি শিক্ষকদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার আরেকটি উদ্যোগ? বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং সংবিধান, ন্যায়বিচার, শিক্ষার স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তাই এ বিষয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ জরুরি।
বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজ কখনও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০২৪ এর জুলাই গনঅভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে শিক্ষকরা শুধু অংশই নেননি, বরং নেতৃত্বও দিয়েছেন।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, পরিচালনা, ব্যাবস্থাপনাতে রাজনীতি বহু বছর ধরেই প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অর্থাৎ শিক্ষক ও রাজনীতির সম্পর্ক আমাদের সামাজিক কাঠামোরই একটি অংশ। এই বাস্তবতাকে পাল্টানো কোনো নির্দেশ বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সহজ নয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এমন একটি ধূসর অঞ্চল তৈরি করেছে, যেখানে তারা সরকারি কর্মচারী নন, আবার সম্পূর্ণ বেসরকারিও নন। তাদের বেতনের ১০০% সরকার প্রদান করে। এর ফলে প্রশ্ন ওঠে— রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত পেশাজীবী কি রাজনৈতিক প্রচারে অংশ নিতে পারেন?
ডিসিদের যুক্তি হলো—যে ব্যক্তি সরকারের বেতন পান এবং একইসঙ্গে নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারে থাকলে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। কারণ আমরা অতীতের বহু নির্বাচনে অভিযোগ দেখেছি—কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা দলীয় পক্ষপাত দেখিয়েছেন। তবে এই যুক্তির একটি সীমাবদ্ধতা আছে।
শুধু নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করেন বলে কোনো পেশাজীবীর সারাবছরের রাজনৈতিক অধিকার কি সীমিত করা যায়?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। নির্বাচনের দিন একজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা পোলিং অফিসারের হাতে কেন্দ্রের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে। তিনি ব্যালট বাক্স থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত সবকিছু পরিচালনা করেন। তার সততা ও নিরপেক্ষতার ওপরই নির্ভর করে একটি কেন্দ্রের সুষ্ঠুতা।
ডিসিদের বক্তব্য—যদি সেই কর্মকর্তা কোন রাজনৈতিক দলের প্রচারে সক্রিয় থাকেন, তাহলে ভোটের দিনের দায়িত্বে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হবে। এ যুক্তি নির্বাচন প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সমস্যা সমাধানের উপায় কি শুধুই রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা?
নাকি যারা প্রচার করেন তাদের নির্বাচন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়াই যথেষ্ট? নিষেধাজ্ঞা ও দায়িত্ব পরিবর্তন—দুটি ভিন্ন বিষয়, যার সামাজিক ও আইনি প্রভাবও ভিন্ন। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দল গঠনের অধিকার দেয়। শিক্ষকরা কি এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন?
এটি শুধু পেশাগত নয়, একটি মৌলিক প্রশ্ন। যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে শিক্ষক সমাজ বলতে পারে—“আমরা সরকারি কর্মচারী নই, তাহলে আমাদের ওপর সরকারি কর্মচারীদের মতো আচরণ-বিধি কেন?” এটা একটি যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন। অন্যদিকে ডিসিরা বলবেন—“আপনারা যদি নির্বাচন পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আপনাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।” এই দ্বৈত অবস্থানই মূল দ্বন্দ্বের জায়গা। বাংলাদেশের আইন এখনো এই বিষয়ে স্পষ্ট নয়।
সুতরাং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেটি আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ডিসিদের আরেকটি যুক্তি হলো—অনেক শিক্ষক রাজনীতি, ঠিকাদারি, সাংবাদিকতা, ব্যবসা ইত্যাদি নানা পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন, ফলে শিক্ষার্থী, পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের মনোযোগ কমেছে। এই যুক্তি আংশিক সত্য। কিন্তু এর কারণ হলো—শিক্ষকতার কম বেতন।পেশাগত স্থিতিহীনতা।রাজনৈতিক নিয়োগ।প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম।তদারকির অভাব।
রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।বরং শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বেতন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা—এসব প্রয়োজন।এমপিও কাঠামো পরিবর্তনও আলোচনার দাবি রাখে।
একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে: নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।এটি বিশ্বের অনেক দেশেই প্রচলিত পদ্ধতি।
এতে মৌলিক অধিকার রক্ষা পাবে, একইসঙ্গে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে। এই আচরণবিধি শুধু রাজনৈতিক নয়, পেশাগত মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
শুধু শিক্ষককে বেঁধে রেখে রাজনীতি বন্ধ করা যায় না।ব্যবস্থাপনা পরিষদ, নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।
যদি এমপিও শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে এর পরবর্তী ধাপে প্রশ্ন উঠবে—তাহলে কি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম আসবে? কেন শুধু শিক্ষক? তারা কি রাষ্ট্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন? বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন কি তাতে ক্ষুব্ধ হবে? যে সমাজে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ইতিমধ্যেই সংকীর্ণ, সেখানে এই নিষেধাজ্ঞা অনেকের কাছেই সন্দেহজনক মনে হতে পারে।
ডিসিদের প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি রয়েছে—সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কোনো ধরনের পক্ষপাত যেন না ঘটে।
এটি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় কিছু সতর্কতা প্রয়োজন—এটি যেন শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ না করে।এটি যেন সারাবছরের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ না করে। এটি যেন আইনসঙ্গতভাবে নির্ধারিত হয়। এটি শিক্ষকদের সম্মানহানি না করে, বরং পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করে।
সর্বোপরি,নির্বাচনের দিন শিক্ষকরা যেন নিরপেক্ষ থাকেন—এটি জরুরি।
কিন্তু সেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। সঠিক সমাধান হলো—রাজনৈতিক অধিকার বজায় রেখে দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ আচরণবিধি প্রণয়ন। ডিসিদের প্রস্তাব সেই আলোচনার সূচনা করেছে।এখন জরুরি—সরকার, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষক সংগঠন এবং আইনবিদ সবাইকে নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গঠন করা। যে নীতি শিক্ষক সমাজকে অপমান নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে তাদের ভূমিকার মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৮/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
