।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের প্রাইভেট শিক্ষা ক্ষেত্রে আন্দোলন এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। নির্দিষ্টভাবে, নন-এমপিও (মাসিক পে অর্ডার)-ভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক–কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেরা দাবি তুলছেন — নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও ভুক্ত করা হোক, যাতে তারা সরকারি সহায়তা পায়, নিয়মিত বেতন–ভাতা নিশ্চিত হয়। এতে সেই শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। এরই প্রেক্ষাপটে সন্সিলিত নন-এমপিও ঐক্য পরিষদ তাঁদের হাতে আন্দোলনের রূপরেখা ধরেছে।
এই মুহূর্তে আন্দোলনের স্লোগান “ডু অর ডাই” — অর্থাৎ “এমপিও নিয়ে ঘরে ফিরবো নতুবা মরবো” আন্দোলন এখন এই রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাব (ঢাকা) সামনে মো সেলিম মিঞা নেতৃত্বে সারা দেশের হাজার হাজার নন-এমপিও শিক্ষক সমাবেশ সহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে সংগঠনটির হাজার হাজার শিক্ষক কর্মচারী।
মাসিক পে অর্ডার (MPO) স্কিম হচ্ছে একটি সরকারি ভাতা/বেতন সহায়তা ব্যবস্থা, যার আওতায় থাকলে শ্রেণি-প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পায়।
কিন্তু এই স্কিমে আনেনি এমন প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এবং সেখানে কর্মরত শিক্ষক–কর্মচারীরা বেতন–ভাতা-সহ সুনির্ধারিত সরকারি নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। উদাহরণস্বরূপ, ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় আছে বলেই সংবাদে দেখা গেছে।
২০২৫ সালের জুনে, নন-এমপিও শিক্ষকদের এক আন্দোলনে বলা হয়েছে, “আমরা ঢাকা থেকে লাশ হয়ে ফিরব যদি এমপিও না দেওয়া হয়” — এমন কঠোর ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
মার্চে একটি সভায় শিক্ষকদের দাবি যুক্তিসঙ্গত বলে স্বীকার করা হয়েছিল, এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া মে মাসে শেষ হবে, জুলাই থেকে বেতন দেওয়া হবে – কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।
শুধু বেতন নয় — সামাজিক মর্যাদা, কর্ম নিরাপত্তা, অবসরের পর পেনশন বা এককালীন ভাতা-সহ অনেক দিকেই ঘাটতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পেনশন/এককালীন ভাতার হাজার হাজার আবেদন পেছিয়ে রয়েছে।
এই অবস্থার কারণে শিক্ষক ও কর্মচারীরা আন্দোলনে নামছেন — কারণ তারা বলছেন, “আমরা বারবার বলছি, কিন্তু প্রতিবাদ ছাড়া আমাদের মর্যাদা ও জীবিকা মজবুত হবে না। আমরা দেশের ভবিষ্যত গড়ি — কিন্তু আমাদের দেখাশোনা নেই।”
এই দাবিগুলো দীর্ঘদিন ধরে উঠলেও কেন সরকারের কার্যকর প্রতিক্রিয়া নেই? এখানে কিছু কারণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
যদি দেখা যায়, এমপিও স্কিমে নতুন প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাজেট ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় নেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির জন্য মাত্র ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা অনেকের মতে যথেষ্ট নয়।
এখানে দেখা যাচ্ছে — সরকারের বাজেট ও নীতি-প্রক্রিয়া, অন্য অনেক প্রতিযোগী দাবির সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষকরা বলছেন: “এই প্রয়োজন কেন অপেক্ষায়?”
এমপিওভুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয় — যেমন: শিক্ষার্থী সংখ্যা, পরীক্ষার্থী সংখ্যা, উত্তীর্ণের হার ইত্যাদি।
এই নীতিগুলো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক সময় পূরণ করা কঠিন হয় — বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা মাদ্রাসা/টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে প্রশাসনিক বিলম্বও রয়েছে। যেমন ঢাকা অঞ্চলে কিছু শিক্ষকের অভিযোগ — “আমরা ৭ মাস ধরে বেতন পাইনি, আমাদের ফাইল জেলা বিভাগে আটকে আছে”।
শিক্ষক আন্দোলনের দাবিগুলো যথার্থ দাবি, এটি শিক্ষার উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারের দৃষ্টিতে হয়তো এই বিষয়টি এখনো “প্রথম সারির” এজেন্ডায় উঠে আসেনি। কখনো বাজেট ঘাটতি, কখনো প্রশাসনিক স্থবিরতা, কখনো রাজনৈতিক মনোযোগের অভাব — এসব মিল রেখে শিক্ষকরা বলছেন, “সদিচ্ছার অভাব” রয়েছে। যেমন এডিটোরিয়ালে বলা হয়েছে, “এই অবস্থা এক গ্রহণযোগ্য শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর”।
প্রধানত যখন একজন বৃহত্তর আন্দোলন প্রস্তুত হচ্ছে — “ডু অর ডাই” স্লোগানে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে — তখন প্রশাসনিক স্তরে হয়তো ঝুঁকিতে পড়ার ভয় কাজ করে: জনবিচ্ছিন্নতা, নিয়ন্ত্রণহীন — এ ধরনের বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। যেমন এক প্রতিবেদনে পুলিশ ওয়াটার ক্যানন ও সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে শিক্ষকদের সমাবেশ খানিক ড্রেস করা হয়েছে।
সুতরাং, সরকারের নীরবতার পেছনে হয়তো একাধিক কারণ কাজ করছে — তবে নন-এমপিও চাকার বাইরে থাকা শিক্ষকদের জন্য এটি শুধুই সময়ের অপেক্ষা নয়; এক ধরনের সামাজিক ও মানবিক বিনষ্টি।
এই আন্দোলনের নেপথ্যে যে সমূহ সমস্যা রয়েছে, সেগুলো মোটামুটি নিম্নরূপ:
আর্থিক অনিশ্চয়তা: বেতন–ভাতার ঘাটতি, বকেয়া থাকলে পরিবার স্থিতিশীল হয় না।
সামাজিক মর্যাদার অভাব: একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি গর্ভবোধ করেন না যে আপনি সরকারি নিরাপত্তার আওতায় আছেন।
শিক্ষা সেবার মানে প্রভাব: যখন শিক্ষক উদ্বিগ্ন, অনিশ্চিত থাকেন — তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর উপর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীলভাবে চলতে পারে না।
বৃহত্তর বৈষম্য: এমপিওভুক্ত ও নন-ভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য আজও রয়েছে — শুধুই বেতনের পার্থক্য নয়, নিরাপত্তারও পার্থক্য রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন: অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজও পেনশন বা এককালীন ভাতা পাচ্ছেন না — অনেকেই মারা গেছেন আগে পাবে।
এই সবই শিক্ষা খাতের দায়িত্বশীলতা ও জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ভঙ্গ করছে। যদি শিক্ষকরা নিজেই নিরাপদ না হন, তাহলে কীভাবে তারা শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথ তৈরি করবেন? এটি শুধুই শিক্ষক সমস্যাই নয় — সমগ্র সমাজের শিক্ষাগত স্বার্থের প্রশ্ন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:
নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ ও দ্রুত বাস্তবায়ন: সরকার প্রতি বছরের বাজেটে নন-এমপিও শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখুক এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা দ্রুত নির্ধারণ করে প্রয়োজনে গতিপ্রকরণ (fast-track) ব্যবস্থা আনুক।
প্রবেশ মানদণ্ডে সহজীকরণ ও প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্তর্ভুক্তি: এমপিওভুক্তির যেসব মানদণ্ড আজ কঠিন হয়ে পড়েছে (যেমন পরীক্ষার্থী সংখ্যা, উত্তীর্ণের হার) — সেসব নিয়ম একটু নমনীয় করা হোক, বিশেষ করে প্রত্যন্ত, দরিদ্র অঞ্চলের ক্ষেত্রে।
সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া ও সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ: যেমন মঙ্গলবার গত মার্চে একটি মিটিং হয়েছিল, শিক্ষকদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করা হয়েছিল। তারপরে বাস্তবায়ন হয়নি। তাই সময়সাপেক্ষ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, মাইলস্টোন নির্ধারণ ও অগ্রগতি মনিটরিং জরুরি।
শিক্ষক নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া: শুধুই বেতন নয় — শিক্ষক হবে সামাজিকভাবে সম্মানিত, নিরাপদ কাজের পরিবেশ পাবেন এমন দৃষ্টিভঙ্গা থাকতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর নিয়মানুবর্তিতার পাশাপাশি শিক্ষকের প্রতিও কল্যাণমূলক নীতি থাকা উচিৎ।
সার্বজনীন শিক্ষা নীতি ও পরিকল্পনায় নন-এমপিও শিক্ষকের অবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা: শিক্ষা খাতের নীতি নির্ধারকরা যদি গণমাধ্যমে বলতেন “নন-এমপিও শিক্ষকরা জাতির সম্পদ” — তাহলে অনেকে আশা দেখত। এই রূপান্তরমূলক মনোভাব দরকার।
এই আন্দোলনের বিষয় শুধুই শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান বা বেতন-ভাতার নয়— এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সামাজিক ন্যায় ও শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উন্নয়ন-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আমাদের শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করছেন যাদের জীবন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। এর প্রভাব পড়ছে তাদের মনোবল ও শেখার পরিবেশে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও মান বুঝতে হলে শিক্ষক–কর্মচারীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা অপরিহার্য।
যখন নন-এমপিও-ভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সহায়তার বাইরে পড়ে যায়, তখন শিক্ষার ক্ষেত্রে দ্বিগুণ চাপ পড়ে — প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়তে পারে, শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের পথে পিছিয়ে পড়তে পারে।
দেশের মানবসম্পদ হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। শিক্ষকদের অবহেলা করলে তিনি সেই সম্পদের সঞ্চালক হিসেবে কার্যকর হতে পারবেন না।
আজকের এই “ডু অর ডাই” স্লোগান শুধুই রটে ওঠা বাণী নয় — এটি বিস্তৃত হতাশার স্বরূপ। নন-এমপিও শিক্ষকদের দাবিগুলো সংগঠিত, যুক্তিসংগত ও সময়োপযোগী। সরকারের মধ্যে নীরবতা শুধু তাদের নীরবতা নয় — আমাদেরই শিক্ষা জাতীয় নীরবতা। এই সংকট দৃষ্টিগোচর করছে: আমরা কি শিক্ষককে শুধুই সময়মতো বেতন দিয়েই সন্তুষ্ট হব, নাকি শিক্ষককে সেই নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেব যা তাদের একটা সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে প্রাপ্য?
এই আন্দোলনটি হয়ত এখনি বড় রাজনৈতিক অজুহাতে আটকে আছে — কিন্তু প্রতিহিংসার নয়, সমাধানের পথ এখানে আছে। যদি শিক্ষকেরা নির্ভয়ভাবে কাজ করতে পারেন, তাহলে দেশ-শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে, জাতির উন্নয়ন হবে। সরকারের প্রতি আহ্বান — আজ বালাই না করে, আজই রূপায়ন শুরু করুন। নন-এমপিও শিক্ষকদের দাবি মাথাব্যথা নয় — এটি সময়োপযোগী ন্যায় ও শিক্ষার গুণগতাধিকার।
নন-এমপিও শিক্ষকদের ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বহু বছর ধরে তারা বেতন-ভাতা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকারের নীরবতা কেবল শিক্ষকদের নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডের বাহক শিক্ষকরা যদি অবহেলিত থাকেন, তবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাবে না। এখন সময় এসেছে সরকারের আন্তরিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয় এবং শিক্ষকরা মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পান।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৬/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
