।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
গত কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এক মনোগ্রাহী চিত্র দেখা গেল — তারেক রহমান তাঁর দলের নিবন্ধনের দাবিতে অনশন বেছে নিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেল থেকে তিনি আগারগাঁও-র নির্বাচন ভবনের সামনে অবস্থান নেন, এবং বৃহস্পতিবার সকালেও ঘোষণা দিয়েছেন, “আমরণ অনশন চলবে”। এই ঘটনা একদিকে যেমন রাজনৈতিক উত্তেজনা জাগিয়েছে, অন্যদিকে এটি তুলেছে গভীর প্রশ্ন: এটি কি গণতান্ত্রিক ঘোর আন্দোলনের অংশ, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থসাধনের এক কৌশল — বা হতে পারে আমাদের নির্বাচনী পরিবেশ এবং নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রতি এক প্রতিফলন?
তারেক জানান, তাঁর দল দেশের অনেক জায়গায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় কার্যালয় রয়েছে, তবুও নির্বাচন কমিশন (নিবন্ধন সংক্রান্ত বিভাগ) বলছে — “কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যায়নি”। তিনি দাবি করেন, হয় দিয়েছে ‘চাপে’ অথবা হয়তো তদন্তকারীদের যত্ন নেওয়া হয়নি — তবে সরকার বা কমিশন কেন নিবন্ধন দিচ্ছে না, সেটা স্পষ্ট নয়।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। দলীয় নিবন্ধন না মিললে বিজ্ঞাপিত সময়সূচিতে অংশগ্রহণ, জনপ্রতিনিধিত্ব বা নির্বাচনী পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা নেয়া কঠিন হবে।
অন্যদিকে, মঙ্গলবারের অনশন কর্মসূচিতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং শেষমেশ স্যালাইন নিতে হয়েছে — যা এক ধরনের সংকেতও বহন করে।
প্রথম দৃষ্টিতে, অনশন হলো শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যাখ্যার এক অংশ — যখন সাধারণ পথ বন্ধ হয়ে যায়, অনশন হয়ে উঠে একমুখি প্রতিবাদ। একজন রাজনৈতিক নেতা যদি মনে করেন যে তার মূল দাবিটিই এখন দেশের নির্বাচনী সংস্কার ও কার্যকর জনগণভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, তাহলে অনশন একভাবেই গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচার, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির আহ্বান হতে পারে।
নিবন্ধন-দ্বিধার মুখে এমন অবস্থায় অহিংস প্রতিবাদ, নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ক্রিয়া হিসেবে নিজস্ব তাৎপর্য বহন করে। সুতরাং অনশনটি হতে পারে গণতন্ত্র রক্ষার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
তবে অপর দিক থেকেও এটি দেখা যায় যে — একটি দল যদি নিবন্ধনের বাধার মুখে পড়ছে, এবং সেই বাধা যদি রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া বা কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে অনশন হয়ে উঠতে পারে “প্রতিক্রিয়া” না হয় “প্রেসার টুল” হিসেবে।
অনশন করা রাজনৈতিক আমজনতার নেতা হিসেবে তারেকের অবস্থান, ইতিহাস, দলীয় পরিচয় ইত্যাদি বিবেচনায় এনে বলা যায় — এই কর্মসূচি হয়তো দলীয় কার্যক্রমকে হাই লাইট করার, মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক মনোযোগ আকর্ষণের একটি কৌশলও হতে পারে। ফলে মানবিক-আন্দোলনমূলক অনশন হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
আর যদি নিবন্ধন-বাধার বিষয়টি হয় প্রশাসনিক অবহেলার কারণে — যেমন সময়মতো আবেদন করা হয়নি, দলীয় তথ্যাদি ব্যাহত হয়েছে, বা সদস্য কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ-প্রমাণাদি নেই,— তাহলে তারেকের অনশন হয়ে উঠতে পারে এক রূপান্তরহীন অবস্থা, যেখানে দাবির লজিক আছে কিন্তু প্রয়োগ বা বাস্তবতা অনুপস্থিত।
এই অবস্থায় আমি বলব — হয়তো এটি ‘দুইয়েরই’ মিশ্র রূপ। দলের নিবন্ধন না দেওয়া নির্বাচনপ্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের ধারণার জন্য উদ্বেগের কথা তুলে ধরছে। সাধারণ নাগরিক, ভোটার অথবা দলীয় কর্মী হিসেবে অনুভব করবে যে তাদের সংগঠন-পরিচালনাও হয়তো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণযোগ্য হতে পারছে না।
একটি নিবন্ধনবিহীন দল কার্যকরভাবে নির্বাচনে যেতে পারে না, প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না — ফলে এই ধরনের বাধা যদি হয় প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে, তাহলে তা নিজেই গণতন্ত্রের সংকট।
অন্যদিকে অনশন একটি রাজনৈতিক ব্যানার হতে পারে, এবং হয়তো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ‘নিবন্ধন বাধা’ নয় — হয়তো দলীয় প্রস্তুতি বা কমিটমেন্ট-ফল কম হয়েছে। অথবা অনশন সেই অংশ হতে পারে রাজনৈতিক সময়সূচি অনুযায়ী স্টেজম্যনেজমেন্টের অংশ। অনশন দীর্ঘস্থায়ী না হলে, সেটা শুধু মিডিয়া ইভেন্ট হয়ে থাকতে পারে।
এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে:
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, কার্যক্রম গঠন, ক্যাম্পেইন প্রস্তুতি সময় নিচ্ছে। নিবন্ধনবিহীনতা অর্থই ফেলছে — দলীয় কার্যকারিতা আয়োজন, ভোটার সঙ্গে যোগাযোগ, প্রশাসনিক ভূমিকা এসব বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অনশন মিডিয়া ও জনমত তৈরিতে কার্যকর হাতিয়ার। জনসাধারণের সামনে নিবন্ধনবাধা, অংশগ্রহণবিহীনতা, ক্ষমতা-শক্তির অনুপাত ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় আসছে।
যদি নিবন্ধন দিতে দেরি হয় বা সন্দেহজনক কারণ থাকে, তা নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। গণতন্ত্রে সংস্থা-বিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।
দলের কার্যক্রম, সদস্যসংগঠন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি যদি দৃঢ় হয় না — নিবন্ধনের জন্য উপযুক্ত নথিপত্র, কার্যক্রমের রেকর্ড, অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুন ইত্যাদি থোক পড়তে পারে। তাই অনশন হয়তো সেই অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ঘাটতির ইঙ্গিতও হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সাধারণত হয় উত্তেজনাপূর্ণ ও দ্বিধাগ্রস্ত। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় লড়াই, নির্বাচন-প্রক্রিয়া-নিয়ন্ত্রণ, মিডিয়া-সাধারণ মত এসব উপাদান জটিল। এই ধরনের অনশন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিরোধী দল একধরনের প্রতিসারি অবস্থানে রয়েছে।
এই মুহূর্তে আমি মনে করি, তারেকের অনশন প্রধানত গণতান্ত্রিক ক্রিয়ার এক অংশ — কারণ এটি নির্বাচন-প্রক্রিয়া, দলীয় অংশগ্রহণ ও জনমন নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের এক আহ্বান। তবে সম্পূর্ণরূপে নির্ভেজাল তার দাবি নয়। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় অংশগ্রহণ ও নিবন্ধন-ম্যাপিং শুধুই প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি প্রস্তুতি, সময়-সাপেক্ষ ও উৎসাহ-সহ হতে হয়। যদি একটি দল দীর্ঘসময় ধরে কার্যকরভাবে কাজ করে আসছেন এবং কমিশন কারণে বাধা দিচ্ছে—তাহলে এটা রাজনৈতিক অবহেলার প্রতিচ্ছবিও। আর যদি প্রতিবন্ধকতা সীমিত হয় বা দলীয় হৃদয়সহ কার্যক্রম দুর্বল হয়—তাহলে অনশন হয় শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনার অংশ।
অতএব, দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে—কমিশন-নিবন্ধন-প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, সময়মতো ও অংশগ্রহণমূলক হয়; দলগুলো যেন তাদের কার্যক্রম, সংগঠন, সদস্যসংক্রান্ত প্রস্তুতি ঠিক রাখে; ভোটার-সাধারণ যেন বুঝতে পারে, এই নিবন্ধন-ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ শুধু একটি দৃষ্টান্ত নয়, তাদের ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্বের পথ।
এটি শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় দাবি নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বড় প্রশ্নগুলোর সঙ্গে জুড়ে আছে।
– যদি এটি হয় সত্যিকার অংশগ্রহণ-অন্বেষণ ও প্রশাসনিক বাধার প্রতিবাদ, তাহলে এটি হবে গণতন্ত্রের কণ্ঠ।
– যদি এটি হয় কৌশলগত প্রকল্প, মিডিয়া-উপযোগী বা প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে, তাহলে এটি হয়ে উঠবে রাজনৈতিক অবহেলার প্রতিচ্ছবি।
দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এখন যেখানে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই অনশন এবং তার উত্তরে কাজ করার সুযোগ, সংকট—সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও দলীয় প্রস্তুতির মধ্যেই রয়েছে আমাদের আগামী দিনের পথ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, তারেকের অনশন যেন হয় একটি সংশোধনের আহ্বান—শব্দ নয়, কর্মে রূপ নেয়।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/৬/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
