।। রাসেল আহমেদ।।
বাংলাদেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত ছিলো সাময়িক। করোনাকালে একটি আপদকালীন ব্যবস্থা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই ব্যবস্থা এখন শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন ধরনের বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে। যেখানে শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, সেখানে তা নির্ভর করছে কেবল ভাগ্যের ওপর। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপ্রেরণার পরিবর্তে হতাশা, অসহায়ত্ব ও অন্যায়ের বোধ তৈরি হচ্ছে।
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে ভালো ফলাফল অর্জন করে, শুধুমাত্র ভালো বিদ্যালয়ে পড়ার আশায়। অথচ ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে এখন তাকে নির্ভর করতে হয় ভাগ্যের ওপর—লটারিতে নাম উঠবে কি না, সেটিই নির্ধারণ করছে তার শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপ। এতে যোগ্যতা ও মেধার কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। বরং “ভাগ্যবান” ও “ভাগ্যহত” শিক্ষার্থীর দুটি নতুন শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
লটারি পদ্ধতিতে স্কুলগুলোর মান ও পরিচিতিও প্রভাবিত হচ্ছে। নামী বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ কেবল ভাগ্যের কারণে নির্ধারিত হওয়ায়, সেখানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ফলস্বরূপ শিক্ষার পরিবেশ ও মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক ভালো শিক্ষার্থী অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিদ্যালয়ে পড়ে তাদের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত করতে পারছে না। এতে সমাজে মেধা বিকাশের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
তাছাড়া, এই পদ্ধতিতে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসম সুযোগের বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে। শহুরে অভিভাবকেরা লটারির ফলাফলের ওপর নির্ভর করে সন্তানকে কোথায় ভর্তি করবেন বুঝতে না পেরে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অন্যদিকে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদেরও সুযোগ সীমিত হয়, কারণ লটারিতে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবার জন্য সমান হলেও বাস্তব সুবিধা কখনো সমান হয় না।
লটারির ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও হারিয়ে গেছে। আগে তারা নিজেদের নীতি ও মানদণ্ডে যোগ্য শিক্ষার্থী বাছাই করতে পারত, এখন সেই ক্ষমতা প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাছে বন্দি। এতে শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রেরণা দুর্বল হচ্ছে।
শিক্ষা এমন একটি অধিকার, যা ভাগ্যের নয়, ন্যায্যতার প্রশ্ন। লটারি ব্যবস্থা সেই ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। করোনাকালে সরকারের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো ছিল, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এটি নতুন ধরনের বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাই এখনই প্রয়োজন ভর্তি ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা—যেখানে শিক্ষার্থীর মেধা, আগ্রহ ও যোগ্যতাকে প্রধান বিবেচনায় রাখা হবে।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড কখনো ভাগ্যের ওপর দাঁড়াতে পারে না। সমতা, ন্যায় ও মানসম্পন্ন শিক্ষার স্বার্থে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে একটি মেধাভিত্তিক, ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সময়ের দাবি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ লটারি প্রথা বাতিল করে, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়নের পথ সহজ করে দিবেন।
লেখক : শিক্ষক ও চিন্তক।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ২৯/ ১০ /২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
