এইমাত্র পাওয়া

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কি সত্যিই জিতেছেন?- এক বাস্তব পর্যালোচনা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

তিন দফা দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে রাজধানীতে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাদের দাবিগুলো ছিল—মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করা এবং উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ।

এই তিনটি দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ন্যায্য অধিকার। কিন্তু এই ন্যায্য দাবির পেছনে শিক্ষকদের যে দীর্ঘ লড়াই, রক্ত, অনশন ও অবিচল অবস্থান— তা যেন এক দুঃখজনক অধ্যায় হয়ে রইল দেশের শিক্ষা ইতিহাসে। রাজপথে শিক্ষক, চোখে অশ্রু দশ দিন টানা আন্দোলন করেছেন শিক্ষকরা।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শিক্ষক রাজধানীতে এসে জড়ো হয়েছেন শুধুমাত্র তিনটি বাস্তব দাবির জন্য। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল বরং কঠোর— পুলিশি লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, শারীরিক নির্যাতন, এমনকি রক্তাক্ত শিক্ষকদের দৃশ্য জাতির বিবেক নাড়া দিয়েছে।

শিক্ষা নামক মহৎ পেশার মানুষগুলো রাজপথে পড়ে থেকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন চালিয়েছেন। এই লড়াই কেবল ভাতার জন্য নয়, এটি ছিল মর্যাদার জন্য। সমাজে যে শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত, তাকে আজ তার মৌলিক দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে হয়েছে—এটাই জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার।

আংশিক সান্ত্বনা, পূর্ণ হতাশা দীর্ঘ আলোচনার পর সরকার যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে তা হলো— শিক্ষকদের মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি, সেটিও দুই ধাপে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ৭.৫ শতাংশ (ন্যূনতম ২,০০০ টাকা), পরবর্তী ধাপে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে বাকি ৭.৫ শতাংশ।

অর্থাৎ দাবিকৃত ২০ শতাংশ নয়, ১৫ শতাংশ। আর চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা— সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ নীরব। এই সিদ্ধান্তে শিক্ষক সমাজের একাংশ আনন্দ প্রকাশ করলেও, প্রকৃত অর্থে এটি অনেকের জন্য হতাশার। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষক, বিশেষ করে জুনিয়র ও স্বল্প বেতনভুক্ত শিক্ষকরা এর কোনো সুফলই পাবেন না। যে বৃদ্ধিটি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় অতি সামান্য।

রাজধানী বা জেলা শহরে দুই হাজার টাকায় বাড়ি পাওয়া তো দূরের কথা, একটি একরুম বাসা ভাড়া করতেও লাগে তিন-চার হাজার টাকা। কারা আসলে লাভবান? বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী আছেন, যার মধ্যে প্রায় চার লাখ শিক্ষক।

এর মধ্যে জুনিয়র শিক্ষকই সিংহভাগ। কিন্তু সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপনে মূলত লাভবান হচ্ছেন সিনিয়র শিক্ষক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা—যেমন অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহ-সুপার, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক। উদাহরণস্বরূপ, ১৬তম গ্রেডের একজন শিক্ষক যার বেতন ৯,৩০০ টাকা, তার ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দাঁড়ায় ১,৩৯৫ টাকা।

এখন তিনি পান ১,০০০ টাকা— অর্থাৎ বাড়ছে মাত্র ৩৯৫ টাকা। অথচ রাজধানীতে একক বাসা ভাড়া ৮-১০ হাজার টাকার নিচে নয়। আবার কলেজের প্রভাষক পর্যায়ের শিক্ষক কিছুটা সুফল পেলেও, মাধ্যমিক স্তরের সহকারী শিক্ষকরা যাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি— তাদের ভাগ্যে যোগ হলো সামান্য বৃদ্ধি। এভাবে দেখা যায়, পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি হয়েছে এমনভাবে যে উপরের স্তরের কিছু শিক্ষক কিছুটা উপকৃত হলেও, নিম্ন ও মধ্যস্তরের শিক্ষকরা বঞ্চিত থেকে গেছেন। এটি মূলত “তেলের মাথায় তেল ঢালা” নীতির উদাহরণ। ‘

শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার বলেছেন, “আজকের দিনটি ঐতিহাসিক।” কিন্তু প্রশ্ন হলো— কাদের জন্য ঐতিহাসিক? একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবলেও, বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে তাঁর সহকর্মীদের বড় অংশ বঞ্চিত। নীতিগতভাবে যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে, তা আংশিক ও অসম। শিক্ষা আন্দোলনের জয় কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।

জয় তখনই বলা যায়, যখন আন্দোলনের সুফল পৌঁছে যায় তৃণমূল পর্যন্ত। অথচ এখানে ঘটেছে উল্টোটা। রাজপথে যারা রোদ-বৃষ্টি সহ্য করেছেন, অনশন করেছেন, তাদের অনেকেই এখন হতাশ ও ক্ষুব্ধ।

সরকারের সিদ্ধান্তপত্রের সংখ্যাগুলো যতই সুন্দর দেখাক না কেন, বাস্তবতার সঙ্গে তার ফারাক আকাশ-পাতাল। একজন গ্রামীণ সহকারী শিক্ষক, যার মাসিক আয় ১৫-১৮ হাজার টাকা, তাকে বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়ালেখা, বাজার, চিকিৎসা—সবই সামলাতে হয় এই সীমিত আয়ে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শিক্ষকের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনেকেই টিউশন বা প্রাইভেট কোচিং করে জীবিকা চালান। অথচ তারা সেই শিক্ষক, যারা সমাজের আলোকিত মানুষ তৈরির দায়িত্ব পালন করছেন।

১৮তম নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অর্ধলাখ তরুণ শিক্ষক এই প্রজ্ঞাপনের কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। তারা সবাই নতুন, কম বেতনে যোগ দিয়েছেন এবং ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য। তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত মানে—“যেই লাউ সেই কদু।” দেশে শিক্ষিত যুব সমাজকে শিক্ষাক্ষেত্রে আকৃষ্ট করতে হলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু যখন দেখা যায়, নতুন শিক্ষকরা পুরনো সমস্যাতেই পড়ে থাকেন, তখন পেশাটির প্রতি আগ্রহ ক্রমে হ্রাস পায়।

সরকার ও শিক্ষক নেতাদের দায়িত্ব সরকার যেমন শিক্ষকদের দাবিগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত, তেমনি শিক্ষক নেতাদেরও ভাবতে হবে— তাদের প্রতিনিধিত্ব কতটা বাস্তবভিত্তিক ছিল। আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর নাম “শিক্ষক আন্দোলন” নয়, বরং “শিক্ষক রাজনীতি।” বাস্তবে দেখা গেছে, দাবি ছিল তিনটি—কিন্তু অর্জন হয়েছে একটির আংশিক অংশ। এই আংশিক অর্জনকে ‘বিজয়’ বলা মানে নিজেদের সাথে আত্মপ্রবঞ্চনা করা।

শিক্ষা খাতের উন্নয়ন কেবল ভবন নির্মাণ বা পাঠ্যক্রম সংস্কার নয়— এটি মূলত মানবসম্পদ উন্নয়ন। শিক্ষকরা সেই মানবসম্পদের মূল চালিকা শক্তি। তাই তাদের জীবনমান উন্নয়নকে ‘খরচ’ হিসেবে নয়, ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা উচিত। বাড়ি ভাড়ার হার সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধি, এবং এমপিও ব্যবস্থার সার্বিক কাঠামো সংস্কার ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হবে না। ন্যায্য দাবি মানতে সরকারের কার্পণ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাজপথে নেমেছিলেন বেঁচে থাকার জন্য, মর্যাদার জন্য। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তে সেই মর্যাদা মেলেনি—মিলেছে কেবল একটি সংখ্যাগত ছাড়। এটিকে বিজয় বলা যায় না। বরং এটি এক অসম্পূর্ণ লড়াইয়ের আংশিক ফল, যা আবারও নতুন আন্দোলনের জন্ম দেবে। শিক্ষকরা হারেননি— তবে জেতেনওনি। হার হয়েছে নীতির, জয় হয়েছে কাগজের সংখ্যার। এখন সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক, সমান সুযোগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড যদি দুর্বল হয়, তাহলে পুরো জাতিই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/২২/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.