এইমাত্র পাওয়া

লক্ষাধিক সেবাপ্রার্থী, আইনজীবী কর্মচারীর জন্য টয়লেট কেবল ১৪টি নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা

নিউজ ডেস্ক।। 

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ২০৯টিতে। তাই আসামি, বাদী, আইনজীবী, আসামি ও বাদীর স্বজন, পুলিশ মিলিয়ে এ বিচারালয়ে প্রতিদিন সমাগম হয় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের।

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ২০৯টিতে। তাই আসামি, বাদী, আইনজীবী, আসামি ও বাদীর স্বজন, পুলিশ মিলিয়ে এ বিচারালয়ে প্রতিদিন সমাগম হয় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের।

তবে বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর জন্য নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। সিএমএম আদালতে আসা সেবাপ্রার্থী, আইনজীবীদের জন্য রয়েছে কেবল দুটি শৌচাগার। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধের কারণে সেগুলোও ব্যবহার করা যায় না।

পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকা, আদালত প্রাঙ্গণে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, অপরিচ্ছন্নতা, খাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকাসহ নানা কারণে ক্ষুব্ধ আইনজীবী ও সেবাপ্রার্থীরা। তারা বলছেন, আদালতে মামলা বেড়েছে। বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ও বেড়েছে। তবে অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়ে গেছে আগের মতোই।

এ বিষয়ে সিএমএম আদালতের নাজির আবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আসে। এটির সঠিক হিসাব দেয়া সম্ভব না। তবে আইনজীবী, বাদী-বিবাদী, আত্মীয়স্বজন, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণীর আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি আদালতে আসেন প্রতিদিন।

সিএমএম আদালত ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় একটি করে পাবলিক শৌচাগার আছে। সেগুলো সেবা নিতে আসা ব্যক্তি, আইনজীবী থেকে শুরু করে অন্যান্য সবাই ব্যবহার করেন। তবে কর্মকর্তা ও বিচারকদের জন্য আলাদা শৌচাগার আছে।’

এ আদালতে সবার জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি। শুধু সিএমএম আদালতই নয়, ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের চিত্রও অনেকটা এমন। যদিও সিএমএমের চেয়ে এ আদালতগুলোয় শৌচাগার কিছুটা বেশি। ফিল্টার পানির ব্যবস্থা থাকলেও চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

তিন আদালতের তথ্যমতে, আগস্ট শেষে এ তিন আদালতে ৩ লাখ ৫১ হাজার ১১৮টি মামলা বিচারাধীন ছিল। আর ঢাকা আইনজীবী সমিতির তথ্যানুযায়ী, ৩৩ হাজারের বেশি আইনজীবী ঢাকার আদালতে সেবা দিচ্ছেন। এর বাইরে সেবা নিতে আসা ব্যক্তি ও আদালতের কর্মচারীসহ বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর জন্য তিনটি আদালতে সব মিলিয়ে রয়েছে মাত্র ১৪টি শৌচাগার।

তবে সেগুলোও অপরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধের কারণে ব্যবহার করা বেশ কঠিন। আইনজীবীরা বলছেন, এত মানুষের ভিড়ে তারা আদালত ভবনের শৌচাগার ব্যবহার করতে পারেন না। পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাসা থেকেই প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আদালতে আসেন।

অন্যথায় আইনজীবী সমিতির শৌচাগার ব্যবহার করেন। দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখার কারণে অনেকে কিডনিসহ নানা জটিলতায় ভোগেন। ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী তাহমিনা সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আদালত এলাকা খুবই অপরিচ্ছন্ন।

ভেতরের ড্রেনগুলোর অবস্থা ভালো না। শৌচাগার সংকট রয়েছে। যেসব আছে সেগুলো নোংরা, দুর্গন্ধের কারণে ব্যবহার উপযোগী না। নারীদের জন্য তিনটি কমনরুম আছে। সেগুলো কোনো রকম ব্যবহার করা যায়। আমাদের মতো নারী আইনজীবীরা বার অ্যাসোসিয়েশন বা বাসার ওয়াশরুম থেকে জরুরি কাজ সেরে আদালতে যাই।

কাজ শেষে আবার বাসায় বা বার অ্যাসোসিয়েশনের ওয়াশরুম ব্যবহার করি। মাঝের সময়ে প্রয়োজন হলেও কষ্ট করে থাকতে হয়।’ খাবারের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে আইনজীবী ফাইজুল আলম শুভ বলেন, ‘আদালতের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারেই ভালো না।

ব্যবহার উপযোগী ওয়াশরুম না থাকার কারণে আইনজীবীদের কিডনিসহ নানা রোগ হচ্ছে। আদালতের ওয়াশরুম ব্যবহার করা যায় না। সেজন্য আদালত চলাকালীন তাদের জরুরি শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও তারা সেটি আটকে রাখেন। দীর্ঘ সময় প্রস্রাব-পায়খানা আটকে রাখার কারণে তারা নানা শারীরিক জটিলতা ও রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।’

সম্প্রতি সরজমিনে দেখা যায়, সিএমএম আদালতের দ্বিতীয় তলার শৌচাগারে তীব্র দুর্গন্ধ। মূল গেট একটি। সেটি দিয়েই নারী-পুরুষ উভয়কেই শৌচাগারে প্রবেশ ও বের হতে হয়। ফলে অনেক নারীই তা ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। জেলা ও দায়রা আদালতের শৌচাগারও বেশ অপরিচ্ছন্ন।

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শৌচাগার কিছুটা পরিচ্ছন্ন হলেও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ঢাকার নিম্ন আদালতে নানা সংকট দাবি করে আইনজীবী কায়দে আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শৌচাগারগুলো স্থানীয় দোকানদার, পথচারীরাও ব্যবহার করে।

আদালত চত্বরে যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়, সামনের ফুটপাতগুলো হকার দখল করে রেখেছে। লিফটগুলোতে দীর্ঘ লাইন থাকে। পানি খাওয়ার প্রয়োজন হলে দোকান থেকে কিনে খেতে হয়। সব মিলিয়ে সেবা নিতে ও সেবা দিতে আসা সবাইকে এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

আদালত চত্বরে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, পুলিশের ভ্যানসহ বিভিন্ন গাড়ি যত্রতত্র পার্ক করে রাখা হয়। এতে আদালত প্রাঙ্গণে নিরবচ্ছিন্ন চলাচল করা সম্ভব হয় না। এছাড়া সামনের প্রধান সড়কের পাশের ফুটপাতগুলো দখল করে দোকানপাট বসিয়েছেন হকাররা। আদালত চত্বর অপরিচ্ছন্ন ও যত্রতত্র ময়লা ফেলে রাখা হয়, পানি নিষ্কাশনের অধিকাংশ ড্রেনই ভাঙা।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির (ভারপ্রাপ্ত) মতিউর রহমান  বলেন, ‘আমাদের আদালত ভবনের আটটি ফ্লোরেই একটি করে শৌচাগার রয়েছে। সেগুলো আইনজীবী, সেবাপ্রার্থী, আদালতের কর্মচারী সবাই ব্যবহার করেন। এ আদালতে এসব বাদে শুধু বিচারকদের জন্য আলাদা শৌচাগার রয়েছে। খাওয়ার পানির জন্য ফিল্টারের ব্যবস্থা আছে। যদিও শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির যে ব্যবস্থা আছে সেটি সন্তোষজনক নয়।

মন্ত্রণালয় শৌচাগারসহ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ হাতে নিয়েছে।’ আদালতে আসা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য নেই কোনো রুম বা জায়গা। কোনো বিশ্রামাগারও নেই। এসব সমস্যার ফলে আদালতের বিচার কার্যক্রম শুরুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীদের বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতে হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম  বলেন, ‘ঢাকার বাইরে জেলা জজ আদালতগুলো খুবই পরিচ্ছন্ন। কিন্তু ঢাকারটি একটি মহল্লার ভেতরে। যে সময় আদালত নির্মাণ করা হয়, সে সময় আইনজীবী ও মক্কেলের পরিমাণ কম ছিল। বর্তমানে শুধু ঢাকা কোর্টের আইনজীবীই ৩৩ হাজারের ওপর।

প্রতিদিন সেবা নিতে আদালত চত্বরে লক্ষাধিক লোক আসা-যাওয়া করে। সেবাগ্রহীতা, আইনজীবী, পুলিশ, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সব মিলিয়ে দুই লাখের মতো মানুষ এখানে আসে। এত মানুষের চাপ কমানোর মতো রাস্তা থেকে শুরু করে কোনো কিছুই ঠিক নেই।

সবকিছুতেই প্রতিবন্ধকতা। সমস্যাগুলো দূরীভূত করার জন্য যৌথভাবে জেলা জজ, মহানগর জজ, সিজিএম ও সিএমএম আদালতের বিচারকসহ আইনজীবী সমিতি একাধিকবার বৈঠক করেছে। সাধারণ মানুষের কোর্ট ফি দিয়ে আদালত চলে অথচ মানুষ এখানে এসে ঠিকমতো কিছুই করতে পারে না।

প্রস্রাব-পায়খানার জন্য তেমন কোনো সুব্যবস্থাপনা নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকার নিম্ন আদালতগুলোর বিচারক থেকে শুরু করে আইনজীবী সবাই অনেক কষ্ট করেন। দুই-একটি এজলাস ব্যতীত অন্যগুলোয় এসি নেই। ফ্যানগুলো কোনোটা চলে, কোনোটা আবার আধা ভাঙা। আইনজীবীদের বসার বেঞ্চগুলোও ভাঙা। শত শত গাড়ি, কিন্তু রাখার কোনো জায়গা নেই। ফলে বিচারক কিংবা বিচারপ্রার্থী উভয়েরই এক কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে যাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

তবে ২০ তলা কমপ্লেক্স তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে এজলাস, গাড়ি পার্কিং, বসার জন্য হলসহ বেশকিছু বিষয়ে প্রস্তাব দেয়া আছে।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.