।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশ বহুত্ববাদী ও সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে বহু ধর্ম, বহু মত, বহু সংস্কৃতির মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে। একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়াই আমাদের সমাজের অন্যতম ঐতিহ্য। এখানে ঈদ যেমন মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, তেমনি দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন। তবে বাস্তবতা হলো—দুর্গাপূজা কেবল হিন্দুদের উৎসব নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। প্রতিটি মানুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, পূজার আনন্দ ভাগ করে নেয়। তাই দুর্গাপূজা আজ শুধুই ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার ইতিহাস দীর্ঘকালীন। প্রাচীনকাল থেকেই এই ভূখণ্ডে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে, নদীর তীরে বা মাঠে প্রতিমা গড়ে ওঠে। পূজা শুধু মন্দিরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মহল্লা, পাড়া ও গ্রামময় এক উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট একটি গ্রামে পূজা মানেই দিনভর ঢাকঢোল, আলোকসজ্জা, নাটক-গান-যাত্রাপালা। আর শহরে পূজা মানেই শিল্প-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় আয়োজন।
ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি জাতি সম্প্রীতির চর্চায় অভ্যস্ত। মুসলিম পরিবার পূজার সময় হিন্দু প্রতিবেশীর ঘরে মিষ্টি পাঠায়, আবার ঈদে হিন্দুরা মুসলমানের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। এই পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা আমাদের সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করেছে।
দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। পূজামণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শিল্পীদের সৃজনশীলতা, শোভাযাত্রার বর্ণিলতা, মেলায় মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। শিশুরা নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মেতে ওঠে, তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে প্রতিমা দর্শনে যায়, বয়োজ্যেষ্ঠরা প্রার্থনায় অংশ নেন। এই আনন্দে ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকে না।
আধ্যাত্মিক দিক থেকে দুর্গাপূজা ন্যায় ও সত্যের জয়গান। মা দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়কে প্রতীকায়িত করেন। এ বার্তা শুধু হিন্দুদের জন্য নয়, সকল মানুষের জন্যই প্রাসঙ্গিক। প্রতিটি ধর্মেই সত্য-মিথ্যার লড়াই এবং শুভ শক্তির জয়ের কথা বলা হয়েছে। ফলে দুর্গাপূজার মূল দর্শন সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন।
দুর্গাপূজা ঘিরে অর্থনীতিতেও প্রাণচাঞ্চল্য আসে। মৃৎশিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করেন, কারিগররা মণ্ডপ সাজান, শিল্পীরা আলোকসজ্জা করেন। ব্যবসায়ীরা নতুন পণ্যের বাজারজাত করেন। গ্রামাঞ্চলের খড়, বাঁশ, সুতলি থেকে শুরু করে শহরের আলোকসজ্জা, পোশাক, প্রসাধনী—সব কিছুর চাহিদা বেড়ে যায়। এতে হাজারো পরিবার জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পায়। পূজাকে ঘিরে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের নয়, সবার জন্য সুফল বয়ে আনে।
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য নানা উদ্যোগ নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, অনুদান প্রদান, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, এবং পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, কিছু অসাধু মহল ধর্মীয় উৎসবকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এ কারণে সরকার ও প্রশাসনকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূজামণ্ডপে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মনিটরিং চালু হয়েছে। এতে কোনো ধরনের অপচেষ্টা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ধর্মীয় উৎসবকে নিরাপদ রাখছে এবং মানুষের মনে আস্থা জাগাচ্ছে।
বাংলাদেশের মূল শক্তি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিটি পর্বে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান একসঙ্গে লড়াই করেছে। আজও দুর্গাপূজায় মুসলমান, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বন্ধুদের দেখা যায় প্রতিমা দর্শনে। এই অংশগ্রহণ আমাদের সামাজিক বন্ধনের অনন্য উদাহরণ।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেমন বলেছেন, “আমরা চাই না নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাটোপে থেকে ধর্ম পালন করতে। চাই নাগরিক হিসেবে মুক্তভাবে যার যার ধর্ম পালন করতে।” এই উক্তিই আমাদের কাঙ্ক্ষিত সামাজিক চিত্রের প্রতিফলন।
তবে স্বীকার করতে হবে, আমাদের সমাজে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ফেক নিউজ, অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক জায়গার ছোট ঘটনা বড় করে উপস্থাপন করা হয়। এ ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় সমাজকে সচেতন হতে হবে। পূজামণ্ডপ কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যেখানে কোনো ধর্মীয় উৎসব পালনে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ঘেরাটোপের প্রয়োজন হবে না। যেখানে হিন্দুরা দুর্গাপূজা, মুসলমানরা ঈদ, বৌদ্ধরা বুদ্ধ পূর্ণিমা, খ্রিস্টানরা বড়দিন—সবাই নির্বিঘ্নে পালন করবে। ধর্ম হবে ব্যক্তিগত, আর উৎসব হবে সার্বজনীন।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা। রাজনীতি বা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ যেন ধর্মীয় উৎসবকে প্রভাবিত না করে। কারণ, উৎসব হলো আনন্দের, একতার, বন্ধুত্বের।
দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের উৎসব নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সম্প্রীতির প্রতীক। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণেই এই উৎসবের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আজকের বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে হলে আমাদের এই সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে।
দুর্গাপূজা হোক সবার উৎসব। আনন্দ ভাগাভাগি হোক সবার মধ্যে। বাংলাদেশ হোক সত্যিকার অর্থেই সম্প্রীতির দেশ।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/২৭/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
