।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
বাংলাদেশের জনজীবনে আজ সবচেয়ে বড় আলোচিত ইস্যু হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাজারে গেলেই সাধারণ মানুষের প্রথম বাক্য—”কিছুই আর হাতের নাগালে নেই”। সত্যিই তাই, আজকের বাজারের চিত্র যেন এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মাছ-মাংস, চাল-ডাল, তেল-নুন—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও এখন দিশেহারা। সংসারের হাসি-খুশি, আনন্দ-উৎসব, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা পূরণও আজ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার বাজারে শুক্রবার সকাল মানেই নিত্যপণ্যের দামে নতুন ধাক্কা। বিক্রেতারা সরবরাহ কমার অজুহাত দেখিয়ে মাছ-মাংসের দাম বাড়াচ্ছেন। অথচ বাজারে ঘুরলে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানেই যথেষ্ট পণ্য মজুদ আছে। তারপরও কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা হঠাৎ বাড়ানো হচ্ছে। গরিবের ইলিশ খ্যাত পাঙাশ-তেলাপিয়া মাছ কিংবা সবচেয়ে সহজলভ্য ব্রয়লার মুরগিও এখন বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে।
একসময় গরুর মাংসের দাম বাড়লে মানুষ সান্ত্বনা খুঁজত ব্রয়লারে। আজ সেই ব্রয়লারও কেজি ১৮০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সোনালি মুরগি ২৮০ টাকা, আর গরুর মাংস সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষ সংসারের বাজেট সামলাবে কীভাবে?
বাজারে গিয়ে দেখা যায়—
দিনমজুর বলছেন, “গরুর মাংস কিনতে পারি না, খাসি তো স্বপ্ন। এখন মুরগিও হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
সরকারি চাকরিজীবী আফসোস করে বলেন, “বাজারে কোনো দরদাম নেই। বিক্রেতারা যা বলেন তাই মেনে নিতে হয়। মাস শেষে বেতনের অর্ধেক চলে যায় শুধু বাজারেই।”
এইসব বাস্তবতার মধ্যে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময় সন্তানদের জন্য বিশেষ দিনে মাংস বা ভালো মাছ কেনা ছিল আনন্দের বিষয়। আজ তা পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। সংসারের টানাপোড়েন মানসিক চাপ তৈরি করছে পরিবারে। দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে শুরু করে বাবা-মা ও সন্তানের আনন্দ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের আগুনে।
বিক্রেতারা দাবি করেন, “চাহিদা বেড়েছে, সরবরাহ কম।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়। ধর্মীয় উৎসব সামনে এলেই পণ্যের দাম বাড়ানো আমাদের দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোতে উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকার বাজারে ভর্তুকি দেয়, মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। বাংলাদেশে তার উল্টো। ফলে প্রশ্ন জাগে—দ্রব্যমূল্যের আগুন কি শুধুই বাজার অর্থনীতির কারণে, নাকি লোভী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণহীন প্রভাবের ফল?
নিম্নবিত্ত মানুষ অন্তত সহায়তা কর্মসূচিতে নাম লেখাতে পারে, কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ে আছে সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থায়। তারা সাহায্য নিতে পারে না, আবার বর্তমান আয়ে সংসার চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তারা নীরবে কষ্ট সহ্য করছে। সন্তানদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, শিক্ষার খরচ মেটানো, ভাড়া দেওয়া—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তদের জীবন এখন অস্বস্তিকর এক দোলাচল।
দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি কেবল পেটের ক্ষুধার কষ্ট নয়, এর প্রভাব পড়ছে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও।
গবেষকরা বলছেন দ্রব্যমুল্যের আগুনে –টিকে থাকার সংগ্রামে মানুষ অনেক সময় ভুল পথে হাঁটে। সংসারের টানাপোড়েনে পরিবারে অশান্তি বাড়ছে। পুষ্টিকর খাবারের অভাবে প্রজন্ম ঝুঁকিতে পড়ছে।
একটি স্বাধীন দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার হলো ন্যায্য দামে খাদ্য পাওয়া। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু অভিযান ও জরিমানার খবর শোনা গেলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষকেই সুরক্ষা দেওয়া—এসব কাজ সরকারকেই করতে হবে।
সমাধানের পথ হিসেবে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন -ব্যবসায়ীদের কারসাজি রোধে নিয়মিত বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।
সরকারি উদ্যোগে রেশনিং বা ভর্তুকিযুক্ত নিত্যপণ্য সরবরাহ জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে হবে।উৎপাদন বাড়াতে কৃষিকে আরও সহায়তা দিতে হবে। ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
“দ্রব্যমূল্যের আগুনে পুড়ছে সংসারের হাসি-খুশি”—এটা শুধু একটি বাক্য নয়, এটা আজকের বাস্তবতা। প্রতিদিনের বাজারে খেটে-খাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস, মধ্যবিত্ত পরিবারের নীরব কান্না, শিশুদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই মিলে এক ভয়ঙ্কর সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সময় এসেছে সরকার, নীতিনির্ধারক ও সমাজের দায়িত্বশীল অংশকে একসাথে এগিয়ে আসার। মানুষের পেটে অন্ন না থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই দ্রব্যমূল্যের আগুন নেভানো এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়—এটা ন্যায়, মানবিকতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/২৬/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
