এইমাত্র পাওয়া

রাষ্ট্রের সংকটে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো: কোন পথে সমাধান?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীরা সবসময়ই একটি বিশেষ শ্রেণি হিসেবে বিবেচিত। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখা, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ কিংবা জনসেবামূলক কাজ পরিচালনায় তারা প্রধান ভূমিকা পালন করেন। সেই হিসেবে তাদের বেতন-ভাতা কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণ নয়  রাষ্ট্রের কর্মদক্ষতা, মনোবল ও নৈতিকতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সম্প্রতি সরকার যে নতুন পে কমিশন গঠন করেছে, তা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো।

প্রশ্ন হলো—এই নতুন কাঠামো কেমন হবে? বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক সংকটের প্রেক্ষাপটে কেমন কাঠামো প্রণয়ন করা সম্ভব? একইসঙ্গে এটাও ভাবার বিষয়, রাষ্ট্র কি কেবল সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা দিতেই সক্ষম, নাকি জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হবে?

বাংলাদেশে গড়ে ৫–৭ বছর অন্তর নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ অষ্টম পে কমিশনের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছিল। তবে তার পর থেকে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাজার অস্থিরতার কারণে সেই কাঠামো এখন আর পর্যাপ্ত নয়।

জুলাই মাসে নতুন কমিশন গঠন করার পর আগস্টে প্রথম সভায় কমিশন দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে। কমিশনের কাজ হলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রস্তাব করা। অর্থাৎ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে—নির্বাচনের আগে নতুন কাঠামো ঘোষণা সম্ভব নয়। কেননা, আর্থিক সংকট এখন ভয়াবহ, অন্যদিকে নির্বাচন আয়োজনও ব্যয়সাপেক্ষ। ফলে বর্তমান প্রস্তাব হলো, বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হবে, তবে বাস্তবায়ন করবে নির্বাচিত সরকার।

সরকারি চাকরিজীবীরা বহুদিন ধরেই উচ্চমূল্যের বাজারের সাথে তাদের আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। রাজধানীসহ বড় শহরে ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ এক দশকে কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ বেতনের হার সেই অনুপাতে বাড়েনি।
নতুন কাঠামো থেকে তাদের প্রধান প্রত্যাশাগুলো হলো:
 যাতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
 যেন বার্ষিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলানো যায়।
 বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য মেগাসিটিতে বাসাভাড়ার অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে।
 জীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী কাঠামো।
 বেতন কাঠামো যেন শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও পুলিশ প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্যের চাপ ও আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপে রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন টাকা।
কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৮-৯ শতাংশের বেশি নয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, যার ওপর সুদের চাপও বাড়ছে।
এ অবস্থায় যদি হঠাৎ করেই লাখো সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ানো হয়, তবে রাষ্ট্রের ব্যয় বেড়ে যাবে অস্বাভাবিক হারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও গভীর হবে। সেই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে আবারও ঋণ নিতে হবে বা নতুন কর আরোপ করতে হবে। এর ফল ভোগ করতে হবে সাধারণ জনগণকে।

নির্বাচন আসন্ন। তাই বেতন কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাও প্রবল। নির্বাচনের আগে নতুন কাঠামো ঘোষণা করা হলে তা ভোটারদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে বিরোধীরা এটিকে “ভোটের রাজনীতি” আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার তাই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—ঘোষণা করা হবে, কিন্তু বাস্তবায়ন করবে নির্বাচিত সরকার। এতে ভোটের আগে সরকারি চাকরিজীবীরা একটি আশ্বাস পাবে, আবার আর্থিক চাপও তাৎক্ষণিকভাবে সামলাতে হবে না।

সরকারি চাকরিজীবীরা দেশে প্রায় ১৬-১৭ লাখ। তাদের পরিবারসহ সরাসরি উপকৃত হবে কয়েক কোটি মানুষ। বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, ফলে বাজারে চাহিদা বাড়বে। আবার এই অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করবে।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরা তুলনামূলকভাবে কম সুবিধা পান। সরকারি খাতের বেতন বেড়ে গেলে বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এতে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

গবেষকেরা বলছেন সামাজিক বৈষম্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে-
 একসঙ্গে সব স্তরে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা।
 নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানো।
 কর্মচারীর কর্মক্ষমতা ও জবাবদিহির ওপর ভিত্তি করে বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা।
 প্রশাসনিক ব্যয় ও অদক্ষ প্রকল্প কমিয়ে বেতন বাড়ানোর জন্য অর্থ সংরক্ষণ করা।
 বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত ও শিল্প-কারখানায় কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম বেতন কাঠামো চালু করা।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা অনেক। তারা মনে করছেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে তাল মেলাতে এটি অপরিহার্য। অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট, বাজেট ঘাটতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এটিকে জটিল করেছে।
অতএব, বাস্তবসম্মত সমাধান হলো—সময়োপযোগী কিন্তু ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো। এতে যেমন সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে না।

সবশেষে বলা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। নতুন কমিশন যদি বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে প্রস্তাব দিতে পারে, তবে তা হবে দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা/এ/২৫/০৯/২৫

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.