।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
উচ্চশিক্ষা একটি জাতির অগ্রগতির প্রাণশক্তি। বিশ্বায়নের যুগে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা-ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং সময়োপযোগী তা নির্ধারণ করে দেয় একটি দেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষা নির্ভর করেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। কিন্তু ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হওয়ার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় নতুন এক যুগের সূচনা ঘটে। একই বছর অনুমোদন পায় দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে ৩২ বছর পর ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর প্রান্তিক বাস্তবতা নয়, বরং উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
১৯৯২ সালের আগে দেশে মাত্র ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। সেগুলোতে প্রতিবছর সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হতো। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর ফলে এই চাপ অনেকটাই কমেছে। বর্তমানে দেশে ১১০টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যা শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে।
নর্থসাউথ, ব্র্যাক, আইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট, এআইইউবি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। এর ফলে মেধাভিত্তিক একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় শক্তি হলো ছাত্ররাজনীতি মুক্ত পরিবেশ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস, মারামারি, ভীতি প্রদর্শন শিক্ষার মানকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াবেন না। ফলে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গঠনের অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
আইটি, বিজনেস, কমিউনিকেশন, মিডিয়া স্টাডিজ, বায়োটেকনোলজি ইত্যাদি আধুনিক ডিসিপ্লিনে শিক্ষা প্রদান করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর ফলে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে।
প্রায় দুই হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। এতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, তেমনি দেশের সংস্কৃতি ও শিক্ষার আন্তর্জাতিক প্রচার ঘটছে।
তবে আশার পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় কিছু গুরুতর সংকটও বিদ্যমান।
অনেক প্রতিষ্ঠানে ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শিক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ থেকে শুরু করে নীতিগত সিদ্ধান্তেও দেখা যাচ্ছে বিরোধ। শিক্ষার্থীরা এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন।
অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। পর্যাপ্ত ল্যাব, গ্রন্থাগার বা গবেষণাগার নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে তারা পিছিয়ে পড়ছে।
শ্রমবাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দিতে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক কোর্স সময়োপযোগী নয়, গবেষণায় বিনিয়োগ কম। ফলে শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষে চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় চারগুণেরও বেশি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি ভীষণ চাপের। অনেকে চাষের জমি বিক্রি করেও সন্তানদের পড়াচ্ছেন। তার ওপর সরকার ভ্যাট আরোপ করেছে, যা অভিভাবকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দিচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষক-কর্মচারীর দলাদলি, দীর্ঘ সেশনজট শিক্ষার্থীদের হতাশ করছে।
অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও খরচ অনেক বেশি, গবেষণার সুযোগ সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন অবকাঠামো নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সীমিত, প্রাইভেটে সুযোগ বিস্তৃত—কিন্তু খরচ সামলাতে গিয়ে অভিভাবকদের নাভিশ্বাস ওঠে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি যদি বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে, তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
নীতিমালার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাধ্য করা উচিত নিজস্ব ক্যাম্পাস, ল্যাব, গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে।
কারিকুলাম সময়োপযোগী করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শ্রমবাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
ভ্যাটের মতো চাপ কমিয়ে অভিভাবকদের জন্য সহনশীল ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নেবেন না। তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নেতৃত্ব বিকাশমূলক কার্যক্রম, বিভিন্ন কমিটি ও ক্লাব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তারা নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন। প্রতিটি সেমিস্টারে শ্রেণি প্রতিনিধি বা মনিটরের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্ব গঠনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯২–৯৩ সাল সত্যিই এক মাইলফলক। তখনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করে দেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথ তৈরি করেন। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন এবং ১৯৯৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা। খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হলো, এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা ও ছাত্ররাজনীতির প্রভাব কমাতে একটি নিরাপদ, শিক্ষামুখী পরিবেশ তৈরি হলো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করেনি, তারা আধুনিক ডিসিপ্লিনে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সচেষ্ট। ব্যবসা শিক্ষা, আইটি, কমিউনিকেশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মিডিয়া স্টাডিজসহ নানা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগমন, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পথও উন্মুক্ত হলো।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও শিক্ষা-বান্ধব নীতিমালার কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ, ছাত্ররাজনীতি মুক্ত এবং শিক্ষার্থীর মনন ও দক্ষতা বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও বর্তমানে কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা, উচ্চ খরচ এবং কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, তথাপি এগুলো সমাধানের যোগ্য।
অতএব বলা যায়, খালেদা জিয়ার সেই যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল কেবল শিক্ষার নয়, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তার দূরদর্শিতা ও নিষ্ঠার কারণে আজ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নানামাত্রিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে খালেদা জিয়ার এই অবদান চিরস্মরণীয় ও অনন্য।
৩২ বছরের যাত্রায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের উচ্চশিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়েছে, বিশ্বায়নের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ করেছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে সীমাবদ্ধতাও কম নয়। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা, অপ্রাসঙ্গিক কারিকুলাম ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই এ খাতের সমালোচনা করেন।
তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন সময় এসেছে এই খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শ্রমবাজারকেন্দ্রিক করার। তাহলেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আশীর্বাদের পথেই এগিয়ে যাবে।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা/এ/২২/০৯/২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল