শিক্ষকের হাত থেকে শাসনের প্রতীক হারিয়ে শিক্ষার মান কি সত্যিই কমেছে?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আলোচনায় বারবার একটি প্রশ্ন সামনে আসে—কেন শিক্ষার মান ক্রমশ নিচে নামছে? কেন শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা আগের মতো নেই? অনেকে এ অবক্ষয়ের শুরু খুঁজে পান শিক্ষকের হাত থেকে বেত কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে। একসময় বেত ছিল শৃঙ্খলার প্রতীক, শিক্ষার্থীর ভয় ও শ্রদ্ধার অবলম্বন, আর শিক্ষকের ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু আধুনিক সময়ের শিশু অধিকার ও সহিংসতা-বিরোধী আন্দোলনের ফলে শিক্ষকদের বেত ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর পর থেকে শিক্ষাব্যবস্থায় যেন এক ধরণের শিথিলতা প্রবেশ করেছে—এমনটাই মনে করেন অনেকে। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি বেত হারানোর কারণে শিক্ষার মান কমেছে, নাকি এর পেছনে আরও গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত কারণ রয়েছে?

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় বেত একটি পরিচিত উপকরণ। প্রাচীন পাঠশালা থেকে শুরু করে মাদ্রাসা কিংবা ব্রিটিশ আমলের বিদ্যালয়—সবখানেই বেত ছিল শিক্ষকের শাসনকার্যের অংশ।

বেত কেবল শাস্তি নয়, বরং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। ছাত্ররা জানত, পড়াশোনা না করলে কিংবা দুষ্টুমি করলে বেতের শিকার হতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হতো এবং শিক্ষকের প্রতি এক ধরণের ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হতো। সমাজও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিল। অভিভাবকেরাও সন্তানের পিঠে বেত পড়া নিয়ে তেমন আপত্তি করতেন না; বরং অনেকে মনে করতেন, “মার না খেলে শিখবে না।”

যখন মানবাধিকার ও শিশু অধিকার আন্দোলন বিশ্বব্যাপী জোরদার হলো, তখন বাংলাদেশেও corporal punishment নিষিদ্ধ হলো। আইনের দৃষ্টিতে শিক্ষকের হাতে বেত রাখা নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হলো। এভাবে শিক্ষকরা একটি “ক্ষমতার প্রতীক” হারালেন।

বেত হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। এখন শিক্ষার্থীরা জানে, শিক্ষক তাকে শাস্তি দিতে পারবেন না। ফলে পড়াশোনায় গাফিলতি বাড়ছে, শৃঙ্খলার ভাঙন হচ্ছে, এমনকি শিক্ষককে অসম্মান করার প্রবণতাও বেড়েছে। আজ আমরা সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখি—শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে, কখনও শারীরিক আঘাত করছে। অথচ আগে শিক্ষকের মর্যাদা এমন ছিল যে, তার সামনে মাথা উঁচু করেও কথা বলার সাহস করত না কেউ।

বেত কেড়ে নেওয়ার পর শিক্ষকের মর্যাদা কমেছে—এমন যুক্তি অনেকেরই। তবে বিষয়টি এত সরল নয়। শিক্ষকের মর্যাদা কমার পেছনে আরও নানা কারণ রয়েছে:

শিক্ষক পেশা এখন আর আর্থিকভাবে সম্মানজনক নয়। কম বেতন, অনিশ্চিত চাকরি, অবসর সুবিধার জটিলতা—এসব কারণে সমাজে শিক্ষকের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষকের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। শিক্ষকরা প্রভাবশালী নেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

আগে শিক্ষককে সমাজপতি, জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। এখন টাকার দাপট, প্রযুক্তির মোহ ও পেশাগত বৈচিত্র্যের কারণে শিক্ষক আর সমাজের শীর্ষ মর্যাদার স্থানে নেই।

বেত নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে শিক্ষকের হাতে কার্যকর শৃঙ্খলামূলক কোনো উপায় নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীর অধিকার আছে সবকিছু প্রশ্ন করার, অভিযোগ করার। ফলে শিক্ষক এক ধরণের ভয়ের মধ্যে কাজ করেন।

তাই বলা যায়, বেত কেড়ে নেওয়া শিক্ষকের মর্যাদা কমার একটি বড় কারণ হলেও, একমাত্র কারণ নয়।

অনেকে বলেন, শিক্ষার মান কমেছে কারণ বেত নেই। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার মান কমার পেছনে আরও গভীর সমস্যা রয়েছে—

শিক্ষা এখন ব্যবসা। কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট পড়ানো—এসবই শিক্ষার্থীর আসল শিক্ষা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে।

বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা—এসব শিক্ষার মান নষ্ট করছে।

ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার চেয়ে বিনোদনে বেশি ব্যবহার হচ্ছে।

অনেক অভিভাবক শুধু নম্বরকেন্দ্রিক শিক্ষা চান। চরিত্র গঠন বা শৃঙ্খলার দিকে তারা মনোযোগ দেন না।

শিক্ষকের হাতে শাসনের প্রতীক থাকলে-শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলা রক্ষা করত।ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা তৈরি করত।অলস ও দুর্বৃত্ত ছাত্ররা ভয়ে হলেও পড়াশোনা করত।

অপরদিকে মানসিক আঘাত সৃষ্টি করত।অনেক শিশু ভয়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দিত।শিক্ষকের প্রতি ভয় থাকলেও প্রকৃত শ্রদ্ধা থাকত না। এ্খানে স্পষ্ট যে, বেতের ওপর নির্ভর করা কোনো টেকসই সমাধান নয়।

অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি-অনেক অভিভাবক মনে করেন,আগে শিক্ষকরা বেত, কানমলা বা কড়া শাসন ব্যবহার করতেন বলে শিক্ষার্থীরা ভয় পেত এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হতো।এখন সে ভয়ের জায়গা নেই, ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে।তারা মনে করেন—“ভালোবাসার শিক্ষা দরকার, তবে শাসনের ভীতি ছাড়া শৃঙ্খলা আনা কঠিন।”

অপর একদল অভিভাবক বলেন,শারীরিক শাস্তি কোনো সমাধান নয়; এতে শিশুদের মনে ক্ষোভ জমে এবং অনেকেই শিক্ষার প্রতি বিরূপ হয়ে যায়।

বর্তমান যুগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে।

তাদের যুক্তি—“শিক্ষার মান কমেছে শাসনের অভাবে নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার নানান ত্রুটি, কোচিং নির্ভরতা, পাঠ্যক্রমের দুর্বলতা এবং সামাজিক চাপের কারণে।”

একদল অভিভাবক মনে করেন,শিক্ষককে শারীরিক শাস্তি না দিয়ে “মনস্তাত্ত্বিক শাসন” বা “শৃঙ্খলামূলক কঠোরতা” দেখাতে হবে।

অর্থাৎ শিক্ষকের কণ্ঠস্বর, দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তরিকতা ও চরিত্র এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই শ্রদ্ধা ও শৃঙ্খলাবোধ অর্জন করে।

শিক্ষকের হাতে বেত তুলে না দিয়েও শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখা সম্ভব। তার জন্য দরকার—

শিক্ষার্থীর ভেতরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে।ভয় নয়, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু নম্বর নয়, শৃঙ্খলা ও আচরণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।শিক্ষকদের শৃঙ্খলামূলক কৌশল শেখানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।শিক্ষার্থীর অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি শিক্ষকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

“শিক্ষকের হাতের বেত কেড়ে নেওয়ার পর থেকে শিক্ষার মান ও মর্যাদা কমেছে”—এই বক্তব্য আংশিক সত্য। বেত শিক্ষকের কর্তৃত্বের প্রতীক ছিল, তা হারানোর পর শিক্ষকের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, শিক্ষার্থীর মধ্যে শৃঙ্খলা কমেছে—এটি মানা যায়। কিন্তু একে শিক্ষার মান অবনতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

আজকের সমাজে শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট অনেক জটিল। শিক্ষককে মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হলে কেবল বেত ফেরানো নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ, পাঠ্যক্রমের উন্নয়ন, এবং সর্বোপরি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের পারস্পরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় জরুরি।

বেত শৃঙ্খলা আনতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মানসম্মত শিক্ষা গড়ে তুলতে পারে না। তাই আমাদের দরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শৃঙ্খলা ও মর্যাদা থাকবে ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে, ভয়ের নয়।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা/এ/২২/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.