বেফাঁস বক্তৃতায় বিদ্বেষের আগুন: মুফতি আমির হামজার দায় কে নেবে?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

ধর্মীয় বক্তৃতা মানুষের আত্মিক উন্নতি, নৈতিক শিক্ষা ও মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। ইসলামি আলোচকরা সাধারণত ধর্মের মর্মবাণী, কোরআন-হাদিসের শিক্ষা এবং মানবজীবনের ইতিবাচক দিকগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কিছু ইসলামি বক্তা এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন যা শুধু বিতর্কই তৈরি করছে না, বরং ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর অপচেষ্টারও বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। এর অন্যতম আলোচিত নাম মুফতি আমির হামজা।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে তার কিছু বিরূপ মন্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এমনকি তার নিজ দল জামায়াতে ইসলামীও তাকে সতর্ক করেছে। এই ঘটনাকে ঘিরে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন ইসলামি আলোচক কি তার কথার জন্য দায় এড়াতে পারেন? ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা কতটা নৈতিক? এবং সবশেষে, এই ধরনের বক্তব্যের দায়ভার কে নেবে?

আমির হামজা সম্প্রতি দাবি করেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে ১৬ বছর ধরে আজান দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি বলেন, বাথরুমে নামাজ আদায় করতে হয়েছে ছাত্রলীগের জুলুমের কারণে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাত্ররা মদ দিয়ে কুলি করত।” এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

শিক্ষাঙ্গন নিয়ে এমন অপমানজনক মন্তব্য শুধু প্রতিষ্ঠানকে নয়, পুরো জাতিকেই আঘাত করেছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো নিয়ে বানোয়াট অভিযোগ তোলা মানে প্রজন্মের স্বপ্ন ও মর্যাদাকে অপমান করা। একজন ধর্মীয় বক্তা যদি তথ্য যাচাই না করেই কথা বলেন, তাহলে তার বক্তব্যের মূল্য আর কতটুকু থাকে?

বিতর্ক বাড়তে থাকলে জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে আমির হামজাকে সতর্ক করে। দলের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা তাকে মাহফিলে রাজনৈতিক বক্তব্য না দিতে এবং কোরআনের তাফসিরে সীমাবদ্ধ থাকতে বলেন। এক সাক্ষাৎকারে আমির হামজা স্বীকার করেন—“তুলনা করে কথা বললেই প্যাঁচ লেগে যায়।” তিনি ক্ষমা চেয়ে বলেন, ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—কতবার ক্ষমা চাইলে একজন বক্তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ক্ষমাযোগ্য হবে? অতীতে ভারতের অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাকে নিয়ে তার এক মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানেও তিনি ক্ষমা চান। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি আবারও ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে একই ধরণের ‘ভুল’ করা কি নিছক ভুল, নাকি এটি তার কৌশলগত প্রচারণা—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

আমির হামজা সম্প্রতি কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে জামায়াতের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন, এমনকি দাবি করেছেন তার পরিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি নিজেও নানাভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—তিনি কি প্রকৃতপক্ষে একজন ইসলামি আলোচক, নাকি রাজনৈতিক প্রার্থী হিসেবে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে উস্কানিমূলক বক্তব্য ব্যবহার করছেন? ধর্মের মঞ্চকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার বানানো হলে সেটি শুধু ইসলামকেই কলুষিত করবে না, বরং ধর্মপ্রাণ মানুষদের মাঝেও বিভ্রান্তি ছড়াবে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক ওয়াজ মাহফিলের বক্তা মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটতে গিয়ে চটকদার ও অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেন। কেউ বিদেশি অভিনেত্রীকে টেনে আনেন, কেউ রাজনৈতিক দলকে টার্গেট করেন, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথা বলেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে শ্রোতাদের হাততালি পাওয়া, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এবং জনপ্রিয়তা কুড়ানো।

কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পেছনে যে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, তা বক্তারা বুঝতে চান না। ধর্মীয় বক্তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। শ্রোতারা বিভ্রান্ত হচ্ছে, আর ধর্মের প্রতি তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক হয়ে উঠছে।

মুফতি আমির হামজা তার বক্তব্যে বলেছেন—“আমি অসুস্থ, কথা বলতে গেলে ভুল হয়।” কিন্তু একজন জনমানুষের বক্তা হিসেবে তিনি কি এভাবে দায় এড়াতে পারেন? ধর্মীয় আলোচকরা হাজার হাজার মানুষের সামনে কথা বলেন। তাদের একটি ভুল বক্তব্যও লাখো মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

তাহলে এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি কে করবে? বক্তা নিজে কি দায় নেবেন, নাকি তাকে আমন্ত্রণ জানানো আয়োজক কমিটি দায়ী হবে? নাকি রাজনৈতিক দল যারা তাকে প্রার্থী করেছে তারাও এ দায় এড়াতে পারবে না? সমাজে প্রভাবশালী যারা, তাদের কথার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতি দেখা দেবে।

ধর্মের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নতুন নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অনেক সময় ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ধর্মকে তাদের সুবিধার জন্য কাজে লাগিয়েছে।

আমির হামজার ক্ষেত্রেও একই জিনিস ঘটছে। তিনি ধর্মীয় বক্তা হিসেবে মাহফিলে বক্তব্য দেন, আবার একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রার্থীও। ফলে তার প্রতিটি বক্তব্য রাজনীতির রঙে রঙিন হয়ে যায়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা, কারণ এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং ধর্মের মূল শিক্ষা আড়ালে চলে যায়।

আমির হামজা একাধিকবার ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বারবার একই ভুল করার পর ক্ষমা প্রার্থনা কি যথেষ্ট? সমাজ কি এতটাই সহনশীল যে, প্রতিবার ক্ষমা চাইলেই দায় মাফ হয়ে যাবে? না, এখানে দরকার দায়বদ্ধতার।

একজন ধর্মীয় বক্তা যদি ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা বা অর্ধসত্য প্রচার করেন, তবে তাকে শুধু সতর্ক করাই যথেষ্ট নয়। বরং তার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ধর্মের নামে মিথ্যা প্রচার করা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং নৈতিক অপরাধও বটে।

ধর্মের মঞ্চ কখনোই বিদ্বেষ ছড়ানোর জায়গা হতে পারে না। বরং ধর্মীয় বক্তাদের উচিত হবে সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া। আমির হামজা যদি প্রকৃতপক্ষে ইসলাম প্রচার করতে চান, তবে তার প্রথম কর্তব্য হবে তথ্য যাচাই করা এবং অযথা বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা।

সমাজ এখন সচেতন। তরুণ প্রজন্ম জানে, সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য কোথায়। তাই ধর্মীয় বক্তাদের উচিত হবে নিজেদের বক্তব্যে দায়িত্বশীল হওয়া। নইলে তারা শুধু নিজেরাই নয়, পুরো সমাজকেই ভুল পথে নিয়ে যাবেন।

সুতরাং, প্রশ্নটা স্পষ্ট—মুফতি আমির হামজার বেফাঁস বক্তৃতার দায় কে নেবে? তিনি নিজে, তার দল জামায়াত, নাকি আমরা সমাজ হিসেবে সবাই মিলে তাকে দায়বদ্ধ করব? এই জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ধর্মীয় মঞ্চ বিদ্বেষ আর মিথ্যার আগুনে পুড়তে থাকবে, আর তার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা/এ/২১/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.