।। সিমরান জামান।।
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি, বেসরকারি এবং অরাজনৈতিক ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে, অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বারা পরিচালিত হয়। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি মূলত প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা নির্ধারণ, শিক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, বাজেট ও তহবিল ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী কল্যাণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী। তাই কমিটির সদস্যদের নৈতিক ও পেশাদার দক্ষতা থাকা অপরিহার্য। সরকারী চাকুরিজীবি এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদরা প্রায়শই এই দায়িত্ব পালন করতে সবচেয়ে যোগ্য বিবেচিত হয়। তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে সক্ষম।
তবুও, বাস্তবে আমরা লক্ষ্য করি যে, অনেক সময় রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি কমিটির সভাপতি বা সদস্য পদে আগ্রহী হন। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ আছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রলোভন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল এবং অনুদান প্রায়শই বড় অঙ্কের হয়। ম্যানেজিং কমিটিতে ক্ষমতা থাকা মানে এই তহবিলের ব্যবস্থাপনায় প্রভাব রাখা। অনেক সময় বাজেটের বড় অংশ প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষণ সামগ্রীতে বরাদ্দ হয়। যদি কমিটির নেতৃত্বে রাজনৈতিক ব্যক্তি থাকে, তাহলে তারা এসব তহবিলের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে স্বার্থসিদ্ধি করতে পারে। অনিয়ম, দুর্নীতি, বা ব্যক্তিগত সুবিধার্থে অর্থ ব্যবহার করাও সম্ভব হয়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য। কোনো এলাকায় বা শহরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতির পদ দখল করা মানে সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি। রাজনৈতিক নেতারা এই পদকে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণ ও ভোটারদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। কমিটির নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে সাহায্য করতে পারে এবং সম্প্রদায়ে প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করে।
তৃতীয়ত, সঙ্গতিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং নেটওয়ার্কিং। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি নেটওয়ার্কিং কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমণ্ডলীর উপর প্রভাব বিস্তার করে, স্থানীয় রাজনৈতিক সমর্থক তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা সামাজিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
তবে শিক্ষক সমাজের দৃষ্টিকোণ সম্পূর্ণ বিপরীত। শিক্ষকরা চাই রাজনীতি মুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা, নৈতিকতা, এবং শিক্ষকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে। শিক্ষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াই বা তহবিলের জন্য ব্যবহার করা হয়। এতে শিক্ষকরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। অনেক সময় শিক্ষকের বক্তব্য বা শিক্ষণপদ্ধতি রাজনৈতিক চাপের কারণে পরিবর্তিত হয়, যা শিক্ষার্থীর জন্য ক্ষতিকর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে যে সমস্যাগুলি দেখা দেয় তা হলো:অর্থনৈতিক অনিয়ম ও দুর্নীতি: কমিটির সভাপতি যদি রাজনৈতিক ব্যক্তি হন, তাহলে ফান্ডের টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষক ও অভিভাবকরা অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়।
শিক্ষকের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়: শিক্ষকরা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। উদাহরণস্বরূপ, পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব বিস্তার, শিক্ষার্থীর নাম পরিবর্তন বা ভর্তি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে।
শিক্ষার্থীর মানহানি: রাজনৈতিক চাপে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও প্রতিভা সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয় না। কিছু শিক্ষার্থী হয়তো বিশেষ প্রভাবশালীর সন্তানের জন্য সুবিধা পান, যা অন্যদের অধিকার লঙ্ঘন করে।
নৈতিক শিক্ষা ব্যাহত হয়: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান প্রদান করে না; এটি শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্বের পাঠ অবহেলিত হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দখলের হাতিয়ার হয়: স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘর্ষ বা সংঘাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হয়।
শিক্ষক সমাজ এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে উদ্যোগী। তাদের দাবি হলো, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নির্বাচন করা হোক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে, যেমন সরকারী চাকুরিজীবি, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, বা সমাজের সুপরিচিত নৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই নিয়ম কার্যকর হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার মূল লক্ষ্য, মানসম্মত শিক্ষা প্রদান, অর্জন করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত অনেক দেশে এই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে এবং শিক্ষার মান বাড়াতে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটিতে অরাজনৈতিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলাদেশেও এটি কার্যকর করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
সমাজের সচেতন অংশও এ পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বারোপ করছে। অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং শিক্ষানীতি গবেষকরা এই দাবিকে সমর্থন করেন। তারা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর জ্ঞান বৃদ্ধি এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্র। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতারা কমিটির সভাপতি বা সদস্য হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্র, যা শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকরা তাই একক কণ্ঠে দাবি তুলেছেন—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। তারা মনে করেন, ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তে সরকারী চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সৎ ও যোগ্য অভিভাবক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে শিক্ষা-শিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশ ঘটানো। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও প্রভাবের মাঠে পরিণত হয়, তবে সেই লক্ষ্য অর্জন কখনো সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি থেকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এটি কেবল শিক্ষক সমাজ নয়, বরং পুরো জাতির প্রত্যাশা।
অপরদিকে জামাত ইসলামী, এনসিপি, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদসহ অনেক সংগঠন স্পষ্টভাবে দাবি তুলেছে—ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিয়ে কেবল সরকারি চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের রাখা হোক। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত অর্থে শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে কাজ করতে পারবে।
কিন্তু এর বিপরীতে বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া ম্যানেজিং কমিটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় না। তারা মনে করে, স্থানীয় রাজনীতিকদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানের নানা সংকট সমাধানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে এই ইস্যুতে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। একপক্ষে শিক্ষক সমাজ ও অধিকাংশ সংগঠনের দাবি—রাজনীতি মুক্ত কমিটি, অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির পক্ষে।
সরকারও কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে বিশেষ বিধি-নিষেধ আরোপ। কিন্তু কার্যকর মনিটরিং এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এখনও চ্যালেঞ্জ। শিক্ষক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সচেতন অভিভাবক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্র। রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থসিদ্ধির কারণে যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিপন্ন হয়, তাহলে শিক্ষার মান হ্রাস পায় এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষক সমাজের দাবির সঙ্গে সমর্থন দিয়ে আমাদের উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতি মুক্ত করা। সরকারী চাকুরিজীবি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদদের মাধ্যমে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করলে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত হবে। এতে শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা এবং শিক্ষক সমাজের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের প্রধান পদক্ষেপ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল