আল আমিন হোসেন মৃধা: গত ৯ সেপ্টেম্বর “মাউশির প্রশিক্ষণ বিতর্ক: নেতৃত্বে থেকেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে ডিডি প্রিম রিজভী” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে প্রশিক্ষণ উইংয়ের উপ-পরিচালক অধ্যাপক প্রিম রিজভীকে শোকজ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষ অধিদপ্তর।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাউশির সাধারণ প্রশাসন থেকে তাকে শোকজ করা হয়। তবে শিক্ষাবার্তা’য় প্রকাশিত প্রতিবেদন মাউশি আমলে নিয়ে এই শোকজ করলেও একই প্রতিবেদনে মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হোসেন কায়েস (বিসিএস-২৯), সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ-৪) ও গবেষণা কর্মকর্তা-৪ মোঃ আকবর আলীর বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও তাদেরকে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি মাউশি।
আরও পড়ুন:
- এনসিটিবিতে কামিয়েছেন টাকা, ডিআইতেও অর্থের নেশায় বুদ ডিডি ওয়াজকুরনী
- মাউশির বিতর্কিত পরিচালক অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশিরকে শোকজ
- বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের ড. খাদেমুল এখন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ
জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ উইং থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়া প্রশিক্ষণে ২০ জনের টিমের মধ্যে ৯ জনকে নিজের পছন্দের লোককে পাঠান মাউশির প্রশিক্ষণ উইংয়ের উপপরিচালক অধ্যাপক প্রিম রিজভী। গত আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ নিজে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি কর্মশালাতে উপস্থিত থাকায় তাকে এই প্রশিক্ষণে না রাখায় প্রশিক্ষণটিকে বিতর্কিত করতে তিনি বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালান বলে অভিযোগ করে প্রশিক্ষণ উইং সূত্র। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর তাকে (প্রিম রিজভী) মহাপরিচালকের বরাবর তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত বক্তব্য প্রদান করতে বলা হয়েছে।
শোকজের চিঠিতে বলা হয়, “মাউশি’র প্রশিক্ষণ বিতর্ক: নেতৃতেত্ব থেকেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে ডিডি প্রিম রিজভী। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ উইং থেকে সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) ১৭ জন প্রশিক্ষকসহ মোট ২০ জনের টিম দক্ষিণ-কোরিয়া পৌঁছেছেন। আইসিটি বিষয়ের শিক্ষকদের বাদ দিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কয়েকজন কর্মকর্তার সুপারিশে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং যার হাত ধরেই প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত করার তালিকার ফাইল উঠেছিল তিনিই রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। প্রশিক্ষণের যাওয়া ১৭ জন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ৯ জন জায়গাপেয়েছেন উপ-পরিচালকের সুপারিশে। এমতাবস্থায়, সূত্রোক্ত পত্র ও পত্রে বর্ণিত পত্রিকায় উল্লিখিত রিপোটের বিষয়ে আপনার লিখিত বক্তব্য এ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের নিকট ০৩ (তিন) কর্মদিবসের মধ্যে প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৮ তম ব্যাচের কর্মকর্তা অধ্যাপক প্রিম রিজভী পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে ছিলেন শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষমতার এক আলোচিত নাম। পিতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, শেখ মুজিবুর রহমানের গণপরিষদের নেতা আর স্বামী আওয়ামী শাসন আমলের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। এই প্রভাবে কর্মজীবনের রাজধানী শহরে এবং শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে চাকরি করেছেন বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের প্রায় পুরো সময়টা। একদিনের জন্যও ঢাকার বাইরে যেতে হয়নি। পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়েছে, রূপ পাল্টিয়ে তিনিও হয়েছেন আগস্ট পরবর্তীতে ঘোর হাসিনা বিরোধী, পরবর্তীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এনসিপির জননী। আগস্ট পর্ববর্তীতে বাগিয়েছেন মাউশির ডিডি পদ।
জানা গেছে, প্রিম রিজভী ২০০৩ সালে ঢাকা কলেজে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর বিএনপি সরকারের শাসন আমল শেষ হয়ে আসে তত্বাবধায়ক সরকার পরবর্তীতে সামরিক নিয়ন্ত্রিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সরকারের ক্ষমতা ছাড়ে ২০০৮ সালের শেষের দিকে। সরকার আসে সরকার যায় সেসময় সামরিক কর্মকর্তা স্বামীর প্রভাবে একই কর্মস্থলে থেকে যান তিনি। ২০০৮ সালের শেষের দিকে আসে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর পদায়ন নেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ ও শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রকল্পের (Secondary Education Stipend Project- SESP) সহকারী পরিচালক পদে। ২০১৪ সালে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্টের (SEQAEP) সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়ন বাগিয়েন নেন তিনি। সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে পদায়নেও নেন পদোন্নতি, চেয়ার পান একই প্রকল্পের উপ-পরিচালক পদের। এরপর ২০১৮ সালে ব্যানবেইসের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়ন পান তিনি। পাঁচ আগস্টের আগে কিছু সময় মাউশির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ওএসডি থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে হাসিনা বিরোধী সেজে ফেসবুকে একাধিক পোষ্ট দিয়ে বিভিন্ন উপায়ে পদায়ন নেন মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার উপ-পরিচালক পদে। সেই থেকেই কর্মরত আছেন তিনি।
উল্লেখ্য, বিগত ১৬ বছর ছিলে আওয়ামী লীগের কন্যা, বর্তমানে এনসিপির জননী অধ্যাপক প্রিম রিজভী মাউশির প্রশিক্ষণ উইংকে বানিয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলের দোসরদের মিলনমেলা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী তিন কর্মকর্তা যারা হাসিনা পতনের আগের দিন মাউশিতে হাসিনার পক্ষে মিছিল করেছিলেন। এই তিন কর্মকর্তাই প্রিম রিজভীর প্রিয় পাত্র। এই তিনজন হলেন, মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হোসেন কায়েস (বিসিএস-২৯), সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ-৪) ও গবেষণা কর্মকর্তা-৪ মোঃ আকবর আলী। মাউশির প্রশিক্ষণ উইংয়ের কোনো সিদ্ধান্ত একক ভাবে নিতে পারেননা পরিচালক। প্রিম রিজভীর দেওয়া সিদ্ধান্তে পরিচালক না করলে ফ্যাসিস্ট এই তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে সরাসরি হুমকি প্রদান করেন তিনি এমনকি পরিচালককে একাধিকবার গালাগালি করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অতীতে কোন উপপরিচালক প্রশিক্ষণ এর সংযুক্ত কর্মকর্তা ছিলনা। একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর থাকা সত্ত্বেও প্রিম একজন সংযুক্ত কর্মকর্তা নিয়েছেন শুধুমাত্র তার ব্যাগ বহন করার জন্য এবং ট্যুরে সঙ্গ দেবার জন্য। প্রিমের প্রিয় ব্যক্তিত্ব আবুল হোসেন কায়েস যিনি বিগত এক যুগ ট্রেনিং শাখায় একই পদে বহাল থাকার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের ৩০টি দেশ ঘুরেছেন। কোন কোন দেশে একাধিকবার গিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে কোরিয়ায় ৭/৮ বার কায়েস নিজে গিয়েছেন। কায়েসের স্ত্রী ফারজানা আকতার সহকারী অধ্যাপক (সমাজকর্ম, ইডেন কলেজ, ঢাকা) একাধিকবার আইসিটি ট্রেনিংয়েও নিয়ে গেছেন বলেন জানা গেছে। গবেষণা কর্মকর্তা আবুল হোসেন কায়েস আগামী নভেম্বরে KOICA Alumni তে ১০ দিনের জন্য দেশের বাহিরে যাচ্ছেন। অত্যন্ত ধূর্ত, ওদ্ধত ও কর্কশ আচরণে সেবা গ্রহীতারা প্রায়শই এই কর্মকর্তার কাছে অপমানিত ও মানসিকভাবে লাঞ্চিত হয়। ২০২৪ এর ৪ আগষ্ট মাউশিতে হাসিনা সরকারের পক্ষে মিছিলকারীদের অন্যতম প্রশিক্ষণ শাখার গবেষণা কর্মকর্তা আবুল হোসেন কায়েস বহাল তবিয়তে মাউশিতে কর্মরত আছে। তার বদলির ফাইল উঠলেও সেটা আটকিয়ে রেখেছেন প্রিম।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
