আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গত ১৫ অক্টোবর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহেদুর রহমানকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধীতা করা এবং পতিত সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে বিক্ষোভ মিছিল ও সভা-সমাবেশ করা এই সংগঠনটির শীর্ষ নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহেদুর রহমানকে শেখ হাসিনা পতনের মাত্র দুই মাসের মাথায় এনআইবির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র ছয় দিনের মাথায় অর্থ্যাৎ ২২ অক্টোবর তার নিয়োগ বাতিল করে সরকার। বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের আরেক নেতা অধ্যাপক ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম। যিনি বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ প্যানেলের প্রার্থী হয়ে সর্বোচ্চ ভোটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা পতনের ঠিক তিন মাস আগে। তাকে এবার রাজধানীর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকার অধ্যক্ষ পদে পদায়ন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অধ্যাপক ড. মোঃ খাদেমুল ইসলামকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির জাহাঙ্গীরনগর সিন্ডিকেট এই পদে পদায়ন করিয়েছেন।
গত ৪ সেপ্টম্বর (২০২৫) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব কাজী নূরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. মোঃ খাদেমুল ইসলামকে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকার অধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়।
ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৪ তম ব্যাচের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। পাঁচ আগস্ট পরবর্তীতে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ছিলেন। ২০২২ সালের ৩০ মার্চ ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম সিরাজগঞ্জের রাশিদাজ্জোহা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পান। এরপর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে মাউশির বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।
আরও পড়ুনঃ
- এনসিটিবিতে কামিয়েছেন টাকা, ডিআইতেও অর্থের নেশায় বুদ ডিডি ওয়াজকুরনী
- মাউশির প্রশিক্ষণ বিতর্ক: নেতৃত্বে থেকেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে ডিডি প্রিম রিজভী
- মাউশিতে চিন্তক ফরহাদ মজহারের শিক্ষা নিয়ে দার্শনিক আলোচনা, বিতর্ক কেন?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৎকালীন রাশিদাজ্জোহা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম ২৩ এপ্রিল ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ প্যানেলের প্রার্থী হিসেবে একাডেমিক কাউন্সিলরদের ভোটে তিনি এই সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের প্যানেরলের সাতজনই নির্বাচিত হন অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের পেশী শক্তির কাছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের জোট ‘শিক্ষক ঐক্য পরিষদ’ পুরো প্যানেল হেরে যায়। এই নির্বাচনে ৩৪৬ জন ভোটারের মধ্যে ২৮৬ জন ভোট দেন। এরমধ্যে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ প্যানেলের প্রভাবশালী প্রার্থী হিসেবে ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম সর্বোচ্চ ভোটে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন।

এই একই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ থেকে জাবির অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল থেকে কলেজ অধ্যক্ষ ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেট সদস্য নির্বাচিত হন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ ও তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর রশিদ।
জানা গেছে, ছাত্রাবাস দখল ও অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে সমালোচনার মুখে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ড. রিজিয়া সুলতানাকে ওএসডি (বিশেষ দায়িত্বে সংযুক্ত) করা হয়। গত ৭ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে সরিয়ে মাউশিতে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সাত আগস্ট থেকেই অধ্যাপক খাদেমুল ইসলামকে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ পদে বসাতে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব (যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী), মাউশির মনিটরিং উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আবু কাইয়ুম শিশির এবং জাবি সিন্ডিকেটের শাহেদ আলম সিন্ডিকেট অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাকে এই পদে বসাতে সক্ষম হয়েছে। এই সিন্ডিকেট জাহাঙ্গীরনগর সিন্ডিকেট নামে পরিচিত।
ড. মোঃ খাদেমুল ইসলাম সিরাজগঞ্জের রাশিদাজ্জোহা সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যক্ষ পদে টানা চার বছর দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় তিনি কলেজটির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নীতিমালা অমান্য করে বিনা রশিদে অর্থ আদায়, কলেজ ফান্ডের অর্থ তছরুপ সহ একাধিক অভিযোগ উঠে। তবে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ জন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সে সময়ের ফ্যাসিবাদী শিক্ষা প্রশাসন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রাবাস দখল ও অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত নানা অভিযোগে ড. রিজিয়া সুলতানা ওএসডি করা হয়েছে। এবার আরেক জন অর্থ আত্মসাৎকারীকে বসানো হলো। ফলে আমরা এখানে কোনো পরিবর্তন দেখছি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ, আওয়ামী সরকারের অঘোষিত পদে থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কলেজে চাকরি করেছেন তারাই এখন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্টেকহোল্ডার সেজে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পদায়ন নিচ্ছেন। আর আমরা যারা সারাজীবন বিভিন্ন মফঃস্বল কলেজে চাকরি করে আসছি সেখানেই এখন অবধি আছি। আর শেখ হাসিনার “গোলামী” করে চলা কর্মকর্তারা আছেন সুবিধাজনক অবস্থানে।
কিভাবে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের রাজনৈতিক নেতা হয়েও পাঁচ আগস্ট পরবর্তীতে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পদায়ন পেলেন জানতে চেয়ে অধ্যক্ষ ড. খাদেমুলের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, একটি সিন্ডিকেট বেশ কয়েকদিন ধরেই তাকে টিটিসির অধ্যক্ষ পদে পদায়ন দিতে চেষ্টা করছিল। সেটা তারা সক্ষম হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের একজন সিনিয়র নেতা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আওয়ামী এই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রুখতে না পারলে শিক্ষা প্রশাসনে ফ্যাসিবাদি দোসরদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন আটকানো যাবে না। এ বিষয়ে সরকারের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বদরুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, সংস্কারের নামে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কারা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বসাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এটাই একমাত্র না। আমরা দেখেছি আগস্ট পরবর্তীতে আওয়ামী সরকারের সুবিধাভুগি ফ্যাসিস্ট ড. এহতেসাম উল হককে মাউশি ডিজি পদে পদায়ন করে যা শিক্ষকদের আন্দোলনে প্রত্যাহার করা হয়। এদের রুখতে হবে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
