।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাত ১১ টা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫। ফেসবুক খুলতেই হঠাৎ মোবাইল স্কীনে ভেসে আসলো বাংলা সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ফরিদা পারভীন আর নেই। তিনি চলে গেছেন না–ফেরার দেশে। শান্ত মনটা নিমিষেই অশান্ত হয়ে উঠলো। ছোট কাল থেকে যার গান শুনে বড় হয়েছি তার বিখ্যাত গানটা মনে পড়ল:
আমি অপার হয়ে বসে আছি,
ওহে দয়াময়,
পাড়ে লহে যাও আমায়।
দয়াময় ফরিদা পারভীনকে নিয়ে গেছেন ওপারে কিন্তু তিনি রেখে গেছেন অমূল্য ধন—লালন, নজরুল, দেশাত্মবোধক কিংবা আধুনিক সংগীতের অনবদ্য ভাণ্ডার। তাঁর কণ্ঠস্বরের মধ্যে ছিল এক ধরনের যাদু, এক ধরনের মায়া, যা শুনলেই শ্রোতাদের অন্তরের গভীরে গিয়ে নাড়া দিত। তাঁর গাওয়া গান যেন কেবল গান ছিল না, ছিল সাধনা, ছিল শিল্প, দর্শন আর আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণ।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার সাত্তঁল গ্রামে জন্ম নেন ফরিদা পারভীন। পিতা দেলোয়ার হোসেনের চাকরিসূত্রে পরিবার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তরিত হলেও সংগীতের প্রতি তার ঝোঁক অল্প বয়সেই ধরা দিয়েছিল। তিনি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সংগীতের বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই—মায়ের দুধ খেতে খেতে মায়ের কণ্ঠে শোনা লতা মঙ্গেশকরের গান ছিল তাঁর প্রথম সংগীত–স্মৃতি।
প্রথমে মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সারগামের শিক্ষা, পরে কুষ্টিয়ায় ওস্তাদ ইব্রাহিম, রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস ও ওসমান গণির কাছে ক্লাসিক্যাল সংগীত শেখা তাঁর শিল্পীসত্তার ভিত্তি গড়ে দেয়। এভাবে নানা ধারা থেকে শিক্ষা নিতে নিতে তিনি সংগীতে এক বহুমাত্রিক পরিচয় অর্জন করেন।
১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুল সংগীতের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। নজরুল সংগীতের গাম্ভীর্য ও ক্লাসিক্যাল ধাঁচ তাঁর কণ্ঠকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁকে লালন সংগীতের দিকে নিয়ে আসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোকছেদ আলী সাঁই।
১৯৭৩ সালে কুষ্টিয়ায় লালন আখড়ায় পূর্ণদাস বাউলের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রথমবার লালনের গান পরিবেশন করেন ফরিদা পারভীন। সেই দিন থেকে তাঁর সঙ্গে লালনের গান যেন অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়। মোকছেদ আলী সাঁই, খোদা বক্স সাঁই, করিম শাহ, ব্রজেন দাস প্রমুখ গুরুশিল্পীর কাছ থেকে তিনি লালনের গানে তালিম নেন।
ফরিদা পারভীন লালনের গানকে কেবল গেয়েই যাননি, তিনি তা নতুনভাবে পরিবেশন করেছিলেন। ফকিরি সুরকে তিনি তাঁর নিজস্ব কণ্ঠস্বরের স্বচ্ছতা আর আবেগের মিশ্রণে এমনভাবে নবায়ন করেছিলেন যে, সাধারণ শ্রোতাও তাতে আকৃষ্ট হতো। লালন তাঁর কাছে কেবল গান ছিল না, ছিল জীবনদর্শন।
ফরিদা পারভীনকে একমাত্র লালন–শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। কারণ, তিনি সমান দক্ষতায় দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান কিংবা আবু জাফরের সুরারোপিত দ্বৈতকণ্ঠের গানও গেয়েছেন। আবু জাফরের সংগীতচর্চায় তাঁর গাওয়া বহু গান আজও বেতার ও টেলিভিশনে বাজে।
১৯৮৭ সালে সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক পান। মজার বিষয় হলো, তখনও তিনি কুষ্টিয়াতেই বাস করতেন। মফস্বল শহরে থেকে জাতীয় পর্যায়ে এতো বড় সম্মান অর্জন করা তখনকার সময়ে ছিল বিরল ঘটনা। ১৯৯৩ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটি তাঁকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
ফরিদা পারভীন ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন সংগ্রামী। আবু জাফরের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের ইতি টানলেও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। পরবর্তীতে গাজী আবদুল হাকিমকে বিয়ে করলেও নিজের শিল্পীসত্তাকে সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সংসার ও সংগীতের টানাপোড়েনের ভেতরেও তাঁর কণ্ঠস্বরের দীপ্তি কখনো ম্লান হয়নি।
শুধু দেশে নয়, বিদেশেও লালন সংগীতকে পরিচিত করে তুলেছিলেন তিনি। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ বহু দেশে কনসার্টে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছিলেন বিশ্ব দরবারে। যেখানে যেতেন, শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন তাঁর সুরেলা কণ্ঠ।
লন্ডন বা টোকিওতে বসেও যখন তিনি “খাঁচার ভেতর অচিন পাখি” গাইতেন, বিদেশিরাও যেন বাংলার মাটির গন্ধ টের পেত। তাঁর গান হয়ে উঠেছিল সীমানা ভেদী, ভাষা ভেদী, সংস্কৃতি ভেদী।
জীবনের শেষ দুই দশক তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। তবে কুষ্টিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজীবন অটুট ছিল। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু গান নিয়ে তাঁর আবেগ কখনো নিভে যায়নি। অবশেষে না–ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন তিনি, রেখে গেলেন হাজারো স্মৃতি, অগণিত গান আর কোটি শ্রোতার ভালোবাসা।
ফরিদা পারভীনকে মনে পড়লে অনেকেই বলবেন, তিনি ছিলেন অমলিন হাসির মানুষ। যে কোনো আসরে তিনি গানে মগ্ন থাকতেন, চোখ বন্ধ করে যেন গানের ভেতরেই হারিয়ে যেতেন। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান মানেই ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভ্রমণ।
স্মৃতিতে ভেসে আসে তাঁর সেই কথাটি—“প্রথম যখন আমার ভেতর সুরটা যায়, আমার মায়ের দুধ খাই তখন।” হয়তো সুরই তাঁর জন্মগত নিয়তি ছিল।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গাওয়া “এমন মানব জনম আর কি হবে”, “তোরা সব জয়ধ্বনি কর”, কিংবা “নিন্দার কাঁটা”—এসব গান আজও আমাদের কানে বাজে। সময় পেরিয়ে যাবে, প্রজন্ম পাল্টাবে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর থাকবে চিরদিন বাঙালির হৃদয়ে।
ফরিদা পারভীনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—তিনি লালনের গানকে ঘর থেকে ঘরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়েছেন। একসময় লালনের গান ছিল সীমিত শ্রোতাদের কাছে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে তা পৌঁছে গেছে প্রতিটি মানুষের অন্তরে।
আজ যখন তরুণ প্রজন্ম লালনের গান শুনে, তারা যেন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে শুনেই শেখে। এটাই তাঁর শিল্পীসত্তার সর্বোচ্চ সাফল্য।
ফরিদা পারভীন চলে গেছেন, কিন্তু তিনি চিরঞ্জীব হয়ে আছেন তাঁর গানের সুরে। লালন যেমন তাঁর দর্শনের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন, তেমনি ফরিদা পারভীন বেঁচে থাকবেন তাঁর গাওয়া গানগুলোর মধ্য দিয়ে।
বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং একটি যুগের প্রতীক। সেই যুগ যেখানে মফস্বল শহর থেকে উঠে এসে বিশ্বকে মুগ্ধ করা সম্ভব হয়েছিল; যেখানে একজন নারী শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন হাজারো শ্রোতার হৃদয়ের প্রাণ।
আমরা তাঁকে হারিয়েছি, কিন্তু তাঁর গান আমাদের হারাবে না কখনো। তাঁর সুর, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর আবেগ বেঁচে থাকবে—যতদিন বাংলা গান বেঁচে থাকবে, যতদিন বাঙালি সংস্কৃতি টিকে থাকবে।
লেখা: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা/এ/১৫/০৯/২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
