নুরাল পাগলার লাশ পোড়ানো: সভ্যতার সীমা ভেঙে বর্বরতার নতুন দৃষ্টান্ত

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও শিউরে ওঠা ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ইমাম মাহদীর দাবিদার নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেয় স্থানীয় একদল তৌহিদী জনতা। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পদ্মার মোড় এলাকায় প্রকাশ্যে সংঘটিত এই ঘটনা মুহূর্তেই দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। এ ধরনের অমানবিক ও অকল্পনীয় ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামী বক্তা মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরী। তাঁর ভাষায়, “এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ঘটল।”

নুরাল পাগলা দীর্ঘদিন ধরে রাজবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায় আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘ইমাম মাহদী’ দাবি করতেন, অপরদিকে অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ তাঁকে ভণ্ড ও বিভ্রান্তকারী হিসেবে দেখতেন। মৃত্যুর পরও তাঁকে ঘিরে দ্বন্দ্ব প্রশমিত হয়নি। বরং তাঁর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই উত্তেজনা চরমে ওঠে। শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় কিছু লোক কবর খুঁড়ে মরদেহ তুলে আনে। এরপর ইসলামের নামে স্লোগান দিতে দিতে প্রকাশ্যে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, উল্লাস করতে করতে তারা “আল্লাহু আকবর” ধ্বনি দিচ্ছে এবং ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।

ইসলামে মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরজ হিসেবে বিবেচিত। কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, মৃত ব্যক্তি জীবনে যত ভুল বা অন্যায়ই করে থাকুক না কেন, তার জানাজা পড়ানো, কবর দেওয়া এবং মরদেহকে সম্মান করা ইসলামী দায়িত্ব। সেখানে কবর খুঁড়ে মরদেহ বের করা এবং তা আগুনে পোড়ানো ইসলামী শরিয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আপনি যদি মনে করেন কোনো ব্যক্তি ভণ্ডামি করেছে, শিরক করেছে কিংবা ধর্ম অবমাননা করেছে—তাহলে ইসলামী ও প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে তার বিচার চাইতেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর মরদেহকে অসম্মান করা, কবর খুঁড়ে লাশ বের করে আগুনে পোড়ানো অকল্পনীয়। স্বাধীনতার আগে-পরে এমন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে বলে কেউ শুনেছে কি?”

বাংলাদেশে এর আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদাররা হাজারো বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে গনকবরে ফেলে দিয়েছিল, লাশ গুম করেছিল। কিন্তু কোনো দিন মুসলমানদের কবর খুঁড়ে মরদেহ বের করে পোড়ানোর ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি। ফলে এই ঘটনাকে অনেকেই সভ্যতা ও মানবতার সীমা ভেঙে পড়ার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে দেখছেন।

ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী—সবাই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, এ কেমন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলছি, যেখানে একজন মৃত মানুষের মরদেহও নিরাপদ নয়?

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের কাজ শুধু আইনের শাসনকেই চ্যালেঞ্জ করেনি, বরং পুরো সমাজে এক ভয়াবহ বার্তা দিয়েছে—“যে ভিন্নমত বা ভিন্ন বিশ্বাসে থাকবে, তার মৃত্যু পরও মর্যাদা থাকবে না।”

ধর্মীয় দিক থেকে এ ঘটনা এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ইসলামে মৃতদেহকে অযথা আঘাত করা, কবর ভাঙা কিংবা মরদেহে হস্তক্ষেপ করা মারাত্মক গুনাহ। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “মরদেহ ভাঙা জীবিত মানুষকে আঘাত করার সমান।” অথচ গোয়ালন্দের ঘটনায় মরদেহ শুধু কবর থেকে বের করা হয়নি, বরং প্রকাশ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি চরম অপরাধ।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কবর খুঁড়ে মরদেহ অপমান করা ফৌজদারি অপরাধ। দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারা অনুসারে, “কোনো কবর বা সমাধিস্থলকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা মরদেহকে অসম্মান করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।” এ অপরাধের জন্য এক বছর থেকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাছাড়া এ ধরনের কাজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেওয়ার অভিযোগও আনা যেতে পারে।

শুধু লাশ পোড়ানোই নয়, ওই ঘটনায় প্রাণও ঝরেছে। নুরাল পাগলার অনুসারী ও স্থানীয় তৌহিদী জনতার সংঘর্ষে রাসেল মোল্লা (২৮) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। ফলে এ ঘটনাকে অনেকে শুধু ধর্মীয় অন্ধতা নয়, সরাসরি সহিংসতার অংশ হিসেবেও দেখছেন।

এমন অমানবিক ঘটনার ফলে সামাজিক ভীত ও অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় উগ্রতা, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে—মরদেহ যদি নিরাপদ না হয়, তবে জীবিত মানুষ কতটা নিরাপদ?

এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাধিক। প্রশ্ন উঠছে, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কেন আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারল না? ভিডিও ফুটেজে যেসব মানুষ মরদেহ উত্তোলন ও দাহে অংশ নিয়েছে, তাদের শনাক্ত করা কঠিন নয়। তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হলো, ধর্মীয় উগ্রতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে। তাই প্রয়োজন— ইসলাম যে মানবিকতার ধর্ম, সেটি সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের বিচারের আওতায় আনা। মানুষকে বোঝানো, ধর্মের নামে সহিংসতা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।  জীবিত ও মৃত উভয়ের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় গভীর দাগ কেটেছে। মানবতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আইনের শাসন—সবকিছুর ওপর আঘাত করেছে এ ঘটনা। ইতিহাসে প্রথমবার এ ধরনের দৃষ্টান্ত সভ্যতার সীমা ভেঙে বর্বরতার নতুন অধ্যায় রচনা করল।

 “আমরা কি বাংলাদেশ দেখছি, নাকি এমন এক সমাজে প্রবেশ করেছি যেখানে মৃতদেহও অরক্ষিত?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন রাষ্ট্র ও সমাজের বড় দায়িত্ব।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা। 

শিক্ষাবার্তা/এ/০৭/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.