এইমাত্র পাওয়া

সহিংসতার রাজনীতি: নুরের ওপর হামলা কি নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বহুদিন ধরেই সংঘাত, সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক সংস্কৃতির কারণে আলোচিত। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সংলাপ ও আলোচনার পরিবর্তে হামলা, ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক আঘাত এবং কখনো কখনো হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-যুবসমাজের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠা নুরুল হক নুরের ওপর বারবার হামলা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং রাজনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। এই ঘটনা আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—বাংলাদেশের রাজনীতি কি আবারও সহিংস অস্থিরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে?

নুরুল হক নুর প্রথম জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে আসেন ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে। তিনি মূলত ছাত্র-রাজনীতির ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি হয়ে উঠেন, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতি মূলত দলীয় এজেন্ডায় সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু নুরের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা নতুন করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়।

নুর হয়ে ওঠেন বিকল্প রাজনীতির প্রতীক।তিনি ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার দাবি তোলেন।
তার আন্দোলন নতুন প্রজন্মের কাছে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের এক সম্ভাবনা হয়ে ওঠে।ফলে নুরের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তিকে আঘাত নয়, বরং বিকল্প নেতৃত্বের স্বপ্নকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

পাকিস্তান আমলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় হামলা ছিল নিয়মিত। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ-ছাত্রদলসহ প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহিংসতায় লিপ্ত হয়।আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতি আবারও সহিংসতার শিকার হয়।২০০০ দশকে বিএনপি-আওয়ামী লীগ বিরোধে সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে সহিংসতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। নুরের ওপর হামলাও সেই দীর্ঘ সহিংস ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা।

নুরুল হক নুর বহুবার বিভিন্ন সংগঠনের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিটি হামলার মধ্যে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য তার ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান সহ্য করতে না পেরে প্রতিপক্ষরা হামলার পথ বেছে নেয়। মূলধারার দলগুলো মনে করে নুরের মতো নেতা জনপ্রিয় হলে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। 

হামলার মাধ্যমে তরুণদের জানিয়ে দেওয়া হয়—বিকল্প রাজনীতি করার সাহস দেখালে এভাবেই দমন করা হবে। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হামলার পরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। বরং হামলাকারীরা পার পেয়ে যায়, যা ভবিষ্যতের জন্য আরও ভয়াবহ বার্তা বহন করে।

গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি হলো সংলাপ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহনশীলতা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্নমত দমন করতে হামলা, গ্রেপ্তার, গুম বা হয়রানি করা সাধারণ ঘটনা।এর ফলে তরুণরা রাজনীতিতে আগ্রহ হারায়।

যারা নতুন ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসে, তারাও ভয় ও আতঙ্কের কারণে পিছিয়ে যায়।গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা শক্তিশালী হয়।নুরের ওপর হামলা তাই শুধু একজন নেতার ওপর আঘাত নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি হুমকি।

নুরের ওপর হামলার পর দেশের রাজনীতি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে:
– নুরকে যারা বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে দেখে, তারা সহিংসতার কারণে হতাশ হয়ে রাস্তায় নামতে পারে।
– যদি বিকল্প নেতৃত্ব দমন করা হয়, তবে মূলধারার রাজনীতির ভেতর প্রতিহিংসা আরও বাড়বে।
– মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিদেশি মহল এ বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারে।
– যদি হামলাকারীরা শাস্তি না পায়, তবে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
এই প্রশ্নগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, নুরের ওপর হামলা রাজনীতির জন্য শুধু অশনি সংকেতই নয়, বরং অদূর ভবিষ্যতে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

নুর যেহেতু ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন, তাই শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।শিক্ষার্থীরা যদি সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে বিকল্প গণআন্দোলন সৃষ্টি হতে পারে।আবার ভয়ের কারণে যদি তারা নীরব থাকে, তবে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বেড়ে যাবে।সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ যদি সোচ্চার না হয়, তবে তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবে যাবে।

সহিংস রাজনীতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, যদি রাষ্ট্র ও সমাজ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়: ভিন্নমতকে দমন না করে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা। হামলার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিত করা।  শিক্ষার্থীদের রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখতে শেখানো। তরুণ নেতাদের সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা শান্তিপূর্ণভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে। নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন গণতন্ত্র সুদৃঢ় হবে না। নুরের ওপর হামলা সেই পুরনো সহিংস প্রবণতারই নতুন বহিঃপ্রকাশ। এটি কেবল একজন তরুণ নেতার ওপর আক্রমণ নয়, বরং একটি প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে—বাংলাদেশ এখনও সহিষ্ণু ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ।

তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি সহিংস রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরে রাখব, নাকি গণতন্ত্রের স্বার্থে সহিষ্ণু ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির পথে হাঁটব? নুরের ওপর হামলা আমাদের সামনে সেই কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এর সঠিক উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা। 

শিক্ষাবার্তা /এ/ ৩০/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.