।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ আটকে থাকে রাস্তায়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। যানজটের বড় কারণগুলোর মধ্যে অটোরিকশা অন্যতম। ধীরগতির এ যানবাহন রাস্তায় শৃঙ্খলা ভাঙে, প্রায়শই ট্রাফিক আইন মানে না এবং প্রধান সড়কে ভারী যানবাহনের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, নগর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু শৃঙ্খলার খাতিরে কি আমরা মানবিকতার দিকটি উপেক্ষা করতে পারি? ঢাকা শহরে লাখ লাখ অটোরিকশা চালক ও মালিক আছেন, যাদের জীবিকা সরাসরি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি অটোরিকশার পেছনে একটি পরিবার রয়েছে, যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর বেঁচে থাকে। হঠাৎ করে নিষিদ্ধ করা হলে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মক সংকটে পড়বে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিলে এই মানুষগুলো রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা কেবল পরিবহন শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, জীবিকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও জড়িত। একদিকে আধুনিক নগরব্যবস্থা, অন্যদিকে নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। তাই প্রয়োজন এমন নীতি, যেখানে নগর শৃঙ্খলা রক্ষা পাবে আবার শ্রমজীবী মানুষও বঞ্চিত হবে না।
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের একটি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকায় গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ ট্র্যাফিক জ্যামে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট করে। এতে কর্মঘণ্টা কমে যায়, অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, মানসিক চাপ বাড়ে এবং পরিবেশও দূষিত হয়।
ঢাকা শহরে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিটি অটোরিকশার সাথে অন্তত একটি পরিবার যুক্ত। যদি গড়ে চারজনের একটি পরিবার ধরা হয়, তাহলে কয়েক মিলিয়ন মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
অটোরিকশা চালকরা সাধারণত প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। তাদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, অন্য কোনো দক্ষতা নেই।
অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন ৫০০–৮০০ টাকা আয় করা যায়। এ আয় দিয়ে পরিবার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা করানো, এমনকি গ্রামে পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করা সম্ভব হয়। অটোরিকশা শুধু যানবাহন নয়, এটি নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনধারণের ভরসা। হঠাৎ করে এগুলো নিষিদ্ধ করা মানে হবে লক্ষাধিক মানুষকে বেকার করে দেওয়া। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।
সাধারণ মানুষের বক্তব্য -অটোরিকশা চলাচলের ফলে শুধু যানজট নয়, বিভিন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়। অটোরিকশা যান্ত্রিকভাবে দুর্বল ও হালকা হওয়ায় দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের মারাত্মক ক্ষতি হয়।ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো মানসম্পন্ন নয়। প্রায়শই ব্যাটারি বিস্ফোরণ বা শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটে।এলোমেলো চলাচলের কারণে বাস বা ট্রাকের ধাক্কায় বড় দুর্ঘটনা ঘটে।যানজট বাড়লে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণও বেড়ে যায়, যা শহরবাসীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ সরকার একদিকে পরিবহন খাতকে আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে। মেট্রোরেল, বিআরটি (বাস র্যাপিড ট্রানজিট), নতুন বাস রুট ইত্যাদি চালু হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে অটোরিকশার মতো অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনও রাস্তায় চলছে।
২০০২ সালে ঢাকা শহরের প্রধান সড়কে রিকশা ও অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ ও জনবিপদের আশঙ্কায় পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি।
স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও কয়েকদিন পর সব আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
চালকদের সংগঠন, মালিক সমিতি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা সবসময় কঠিন হয়েছে।
ঢাকা নগরীতে ই-রিকশা বা অটোরিকশা ব্যাপকভাবে ব্যবহার হওয়া সত্ত্বেও এগুলোকে আইনের দৃষ্টিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুইটি প্রধান আইন ও বিধি প্রাসঙ্গিক—মোটর ওয়ানিকলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩ এবং পরবর্তীতে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ (যা অর্ডিন্যান্সকে প্রতিস্থাপন করেছে)।
মোটর ওয়ানিকলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩-এর ধারা ৩২ অনুযায়ী কোনো যানবাহনই পাবলিক রাস্তায় যাত্রী বা মালপরিবহনে ব্যবহার করা যাবে না যদি না তা বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন করা থাকে ।
অন্যদিকে ধারা ৪৭ নির্দেশ করে ফিটনেস সার্টিফিকেট (Form J) না থাকলে চালনা বেআইনি। তারপরও অনেক ই-রিকশা এসব ছাড়াই ছুটছে ।
ধারা ১৫২ অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট অথবা নির্ধারিত রুট ও শর্ত না মানলে, প্রথম অপরাধে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়, এবং পরবর্তীতে ছয় মাস বা ৫,০০০ টাকা—or উভয়—শাস্তির বিধান রয়েছে ।
হাইকোর্টের নির্দেশক্রমে ২০১৪ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাটারি চালিত রিকশা (ই-রিকশা) নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; আবার ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর অতিরিক্ত নির্দেশনা জানায় এ ধরনের যান আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা । ঢাকায় ই-রিকশা নিষিদ্ধ হলেও চালক হঠাৎ পথে নামলে সংঘর্ষসহ অশান্তি দেখা দিয়েছে ।
২০২১ সালে তিনচার হুইলার ও ছোট যান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নীতিমালা খসড়া তৈরি হয়েছিল। যদিও এটি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনেক নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন হয়নি । ২০২৪ সালে সরকার ই-রিকশা খাতে আইনি কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে চালক দণ্ড ও বন্দোবস্তের ঝুঁকি কমে ।
এখানেই মূল প্রশ্ন। যদি অটোরিকশা তুলে দেওয়া হয়, তবে হাজারো চালক কীভাবে বাঁচবে?
সরকার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের অন্য কাজে নিয়োজিত করতে পারে, তবে সমাধান সম্ভব।
গণপরিবহনে নতুন নিয়োগ বা সার্ভিস খাতের অন্যান্য চাকরিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ বা সরকারি প্রকল্পে কর্মসংস্থান তৈরি করা দরকার।
কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবে যথাযথভাবে হয়নি। তাই অটোরিকশা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বারবার ঝুলে গেছে।
অটোরিকশা সমস্যার সমাধানে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিচে কয়েকটি বাস্তবসম্মত সুপারিশ দেওয়া হলো—
হঠাৎ করে পুরো শহর থেকে অটোরিকশা তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট সড়কে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
প্রথমে প্রধান সড়ক ও মহাসড়ক থেকে নিষিদ্ধ করা।পরে শহরের অভ্যন্তরীণ রাস্তায় সীমিত করা।
অটোরিকশার বিকল্প হিসেবে ছোট আকারের বৈদ্যুতিক বাস বা শেয়ারড ভ্যান চালু করা যেতে পারে। এতে চালকদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
অটোরিকশা চালকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বাস বা অন্যান্য যান চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা নতুন কাজে যোগ দিতে পারবে।
সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ বা স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করে তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত করা যেতে পারে।
যে অটোরিকশাগুলো অনুমোদনহীন, সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা দরকার। একইসঙ্গে সড়ক নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা শুধু পরিবহন খাতের সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়। তাই সমাধান খুঁজতে হবে ভারসাম্যের মাধ্যমে।নগর জীবনে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আনতে হলে যানজট কমাতে হবে।কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা নষ্ট করে কোনো সমাধান টেকসই হবে না।তাই সরকারের উচিত অটোরিকশা চালকদের শত্রু মনে না করে তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়ে পরিকল্পনা করা।
ঢাকা শহরের পরিবহন সংকট নিরসনে অটোরিকশা বড় বাধা, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এগুলো যানজট, দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার কারণ। কিন্তু একইসঙ্গে এগুলো হাজারো পরিবারের কর্মসংস্থানের ভরসা। তাই হঠাৎ করে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়।
শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং বাস্তব বিকল্প তৈরি করেই সমাধান করতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন, বিকল্প পরিবহন চালু করা—এসব উদ্যোগের মাধ্যমেই ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত ও আধুনিক করা সম্ভব। তাহলে একদিকে চালক মালিকরা বাঁচবে অপরদিকে যানজটমুক্ত হবে ঢাকা মহানগরী।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/২৬/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
