এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষা সংস্কার : সাফল্য, ব্যর্থতা ও প্রত্যাশা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তন ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকার শিক্ষাকে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার বলয় এবং আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থা একদিকে যেমন উন্নতির কিছু ধাপ অতিক্রম করেছে, তেমনি ধারাবাহিকতার অভাবে নানা সংকটে পড়েছে। শিক্ষার গুণগত মান, নীতির অস্থিরতা, শহর-গ্রামের বৈষম্য, পাঠ্যক্রমের বারবার পরিবর্তন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি—সব মিলিয়ে আজকের শিক্ষাব্যবস্থা নানা প্রশ্নের মুখোমুখি।

১৯৭২ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। কমিশনের মূল সুপারিশ ছিল বিজ্ঞানমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অধিকাংশ সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। সমালোচকরা বলেন, যদি এই কমিশনের সুপারিশসমূহ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হতো, তবে বাংলাদেশ আজকের মতো মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে অনেক দূরে এগিয়ে যেত।

১৯৮০-এর দশকে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে সাক্ষরতার হার দ্রুত বেড়ে যায়। তবে সমালোচনা হলো—একই সময়ে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে এক ধরনের আদর্শিক বাঁধনে আটকে দেয়। প্রশ্ন উঠেছিল—রাষ্ট্র কি শিক্ষাকে আধুনিক বিজ্ঞানের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি ধর্মীয় মতাদর্শকে প্রাধান্য দেবে?

নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি কার্যক্রম নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, এই উদ্যোগ লিঙ্গ সমতা আনলেও গুণগত মান উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখেনি। অনেক বেসরকারি স্কুল-কলেজ mushrooming-এর মতো বেড়ে ওঠে, যেগুলোর মান প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থাৎ সংখ্যাগত বৃদ্ধি হলেও মানগত উন্নয়ন হয়নি।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ একটি আধুনিক নীতি হলেও এর বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল সুস্পষ্ট। সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর সময় শিক্ষক প্রশিক্ষণ উপেক্ষা করা হয়। গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষকেরা নতুন পদ্ধতি বুঝতেই পারেননি, ফলে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়।

সমালোচকরা বলেন, শিক্ষানীতি কোনো সরকারের একার মালিকানা হতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার নিজেদের মেয়াদে নীতি বানায়, যা পরবর্তী সরকার বাতিল বা পরিবর্তন করে। এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।

নতুন কারিকুলামে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক কাজ ও পরীক্ষার চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ পাননি, বইয়ে অসংখ্য ভুল ছিল, আর প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব প্রকট। গ্রামে শিক্ষার্থীরা প্রায় অচলাবস্থায় পড়েছে।

এটি একটি বড় সমালোচনার জায়গা—কোনো নতুন নীতি চালুর আগে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয় না। সরাসরি পুরো দেশে চালু করে দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে পরীক্ষার ইঁদুর বানানো হয়।

প্রায় প্রতি বছরই পাঠ্যপুস্তকে অসংখ্য বানান, তথ্যগত ভুল ধরা পড়ে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, এটি কেবল অবহেলা নয়; বরং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দক্ষ জনবলের অভাবের প্রতিফলন।

২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার আবার পুরনো পদ্ধতিতে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের ঘন ঘন পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে যেতে পারছে না। শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র।

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ কমালেও মানের দিক থেকে দুর্বল। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, আসন শূন্য থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা নষ্ট হওয়া—সবই এই ব্যবস্থার সমালোচ্য দিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও বুয়েট গুচ্ছের বাইরে থাকায় দ্বৈত ব্যবস্থা তৈরি হয়। আবার ২০২৪ সালে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা নেয়, যা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বিভ্রান্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষার ভর্তি ব্যবস্থা আজও স্থিতিশীল হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ শিক্ষক প্রমোশন ও চাকরির নিরাপত্তায় মনোযোগী; গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চা গৌণ হয়ে পড়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা আসলে বেকার তৈরি করছে, দক্ষ জনশক্তি নয়।

সরকার যায় সরকার আসে। প্রতিটি সরকার নতুন নীতি আনে, কিন্তু কেউই পুরনো নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে না। নতুন কারিকুলাম বা পদ্ধতি চালুর আগে শিক্ষককে প্রস্তুত করা হয় না। শিক্ষা নীতি রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার হয়ে গেছে। ভর্তি ও উপবৃত্তি বাড়লেও মানোন্নয়নে অগ্রগতি কম। প্রযুক্তি, শিক্ষক, অবকাঠামো—সবক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকা বঞ্চিত। উচ্চশিক্ষা বিশ্বমানের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে।

রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হলেও নীতির পরিবর্তন হবে না, এমন একটি স্থায়ী নীতি প্রয়োজন। শিক্ষকেরা যেন নতুন পদ্ধতিতে দক্ষ হন, এজন্য প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। গ্রামীণ বিদ্যালয়েও ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ২% ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। এটিকে অন্তত ৫% পর্যন্ত বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একক জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা বা সমন্বিত কিন্তু মানসম্পন্ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা ও সৃজনশীল চিন্তার চর্চায় জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সংখ্যাগত সাফল্য থাকলেও মানগত উন্নয়নের অভাব স্পষ্ট। ঘন ঘন পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং গবেষণার অভাব আমাদের শিক্ষাকে এগোতে দিচ্ছে না।

ভবিষ্যতে যদি একটি দলনিরপেক্ষ, দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং দক্ষ নাগরিক ও বিশ্বমানের মানবসম্পদে পরিণত হবে। শিক্ষা হবে উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।

লেখা: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা। 

শিক্ষাবার্তা /এ/ ০২/০৯/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.