।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ডিজিটাল যুগে তথ্য প্রবাহের গতি বেড়েছে বহুগুণে। এক সময় খবর মানেই ছিল সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিও। কিন্তু ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার পর মানুষের তথ্য সংগ্রহের ধারা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম অনেক সময় পত্রিকা কিনে পড়ে না, টেলিভিশনে সংবাদ দেখতে বসে না বরং ফেসবুক নিউজ ফিডেই খুঁজে নেয় দৈনিক খবর। এই প্রবণতা যেমন নতুন তথ্য জানার সহজ সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এর সুযোগ নিয়েছে নানা অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। তারা গণমাধ্যমের আদলে ফেসবুক পেজ খুলে খবর প্রচার করছে, অথচ সেই খবরের অনেকটাই ভুয়া, বিকৃত অথবা উদ্দেশ্যমূলক। এর ফলে সাধারণ পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি বেড়ে চলছে আশঙ্কাজনক হারে।
২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারের বিস্তার ঘটে। প্রথমে এটি ছিল বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, ছবি শেয়ার বা ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি জানানোর মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে বিকল্প সংবাদমাধ্যম। প্রথাগত গণমাধ্যম যখন নির্দিষ্ট কাঠামো, নীতিমালা ও সম্পাদকীয় নীতির মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তখন ফেসবুক পেজগুলোর জন্য এমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
একজন ব্যবহারকারী সহজেই একটি ফেসবুক পেজ খুলে সেখানে সংবাদ প্রকাশ শুরু করতে পারেন। নামও রাখতে পারেন এমনভাবে—যাতে সাধারণ মানুষ প্রথম দেখায় সেটিকে একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের শাখা মনে করে।
এই ধরনের পেজ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
ফেসবুকে পেজ খোলা বিনামূল্যে এবং খুব সহজ। কোনো নিবন্ধন বা সরকারি অনুমতি লাগে না। অনেক পেজ বিজ্ঞাপন, বুস্টিং এবং ক্লিকবেইট শিরোনামের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। নির্বাচনের আগে বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে ঘিরে অনেক পেজ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া খবর ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে। মানুষ এখন দ্রুত খবর জানতে চায়। টিভি সংবাদ পর্যন্ত অপেক্ষা করার চেয়ে ফেসবুক স্ক্রল করেই খবর জেনে নেয়। সাধারণ পাঠকের মধ্যে খবর যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে ভুয়া খবরও সত্যি মনে হয়।
গণমাধ্যমের আদলে তৈরি এসব পেজ মূলত তিন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে:
সম্পূর্ণ মনগড়া তথ্য প্রচার, যেমন—কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ, যা আসলে সত্য নয়। কোনো ঘটনার কিছু অংশ সত্যি হলেও বাকিটা বিকৃত করা হয়। যেমন—কোনো নীতিমালার পরিবর্তনের খবরকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা। পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত শিরোনাম ব্যবহার করা হয়। যেমন—“অবশেষে পদত্যাগ করলেন প্রধানমন্ত্রী!”, অথচ ভেতরে গেলে দেখা যায়, কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। গুজব ছড়িয়ে পড়লে হঠাৎ করে জনরোষ সৃষ্টি হয়। অতীতে “ছেলেধরা” গুজবে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিভ্রান্তিকর খবর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। জনগণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো কোম্পানি বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ালে তার সুনাম নষ্ট হয়, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় কোনো শিক্ষক, চিকিৎসক বা সাধারণ মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করতে ভুয়া খবর ছড়ানো হয়। এতে তার সামাজিক অবস্থান নষ্ট হয়।
প্রথাগত সাংবাদিকতা কেবল খবর পরিবেশনের কাজ নয় এটি সত্য যাচাই, তথ্যসূত্র অনুসন্ধান, সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ এবং নৈতিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। একজন সাংবাদিক যখন কোনো সংবাদ তৈরি করেন, তখন তাঁকে নির্ভরযোগ্য উৎস খুঁজে বের করতে হয়, তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয় এবং দায়িত্বশীলভাবে জনসম্মুখে তা উপস্থাপন করতে হয়। ফলে সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিওর সংবাদ তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়।
অন্যদিকে, ফেসবুক সাংবাদিকতা একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। এখানে মোবাইল হাতে একজন ব্যবহারকারী মুহূর্তেই একটি পোস্ট দিতে পারেন এবং সেটি খবরের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো যাচাই নেই, কোনো সম্পাদকীয় নীতি নেই, নেই দায়বদ্ধতাও। অনেক সময় ভুয়া খবর, ক্লিকবেইট শিরোনাম বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। এর ফলে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, সমাজে গুজব ছড়ায়, এমনকি সহিংস ঘটনাও ঘটতে পারে।
তবে ফেসবুক সাংবাদিকতার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানকার তাৎক্ষণিক ছবি বা ভিডিও ফেসবুক ব্যবহারকারীরাই প্রচার করেন। এতে দ্রুত তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো—এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয় না।
অতএব বলা যায়, সাংবাদিকতা ও ফেসবুক সাংবাদিকতার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও দায়বদ্ধতা। প্রথাগত সাংবাদিকতা নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতার মধ্যে আবদ্ধ, আর ফেসবুক সাংবাদিকতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণহীন। পাঠক সমাজকে তাই সচেতন হতে হবে—কোন খবর পেশাদার সাংবাদিকতার ফসল আর কোনটি কেবল ফেসবুকের তাৎক্ষণিক পোস্ট।
ভুয়া সংবাদ নিয়ন্ত্রণে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে। তবে এ আইনকে নিয়ে সমালোচনা আছে—এটি কখনো কখনো সত্যিকারের সাংবাদিকদেরও হয়রানি করে। ভুয়া ফেসবুক পেজ বন্ধ করা হয় বটে, কিন্তু তারা আবার নতুন নামে ফিরে আসে। কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট নীতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বই এই সমস্যায় ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচনে ভুয়া ফেসবুক নিউজ বড় প্রভাব ফেলেছিল। ভারতে গুজবের কারণে জনতা উত্তেজিত হয়ে বহু মানুষকে হত্যা করেছে। তাই উন্নত দেশগুলোও এখন মিডিয়া লিটারেসি ও ডিজিটাল নীতি কঠোর করছে।
সরকারকে স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে সংবাদমাধ্যমের আদলে ভুয়া পেজ চালানো বন্ধ হয়। ফেসবুককেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে । অ্যালগরিদম উন্নত করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোকে নিয়মিত পাঠককে সচেতন করতে হবে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিডিয়া লিটারেসি শেখানো জরুরি। গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে, যাতে ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর ধারা চিহ্নিত করা যায়।
ডিজিটাল যুগ আমাদের দ্রুত তথ্য দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে দিয়েছে বিভ্রান্তির ঝুঁকি। গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ফেসবুক পেজগুলো সমাজে অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে। সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে।
এখনই যদি সরকার, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যম ও সাধারণ পাঠক একসঙ্গে উদ্যোগ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৯/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
