।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শিক্ষা খাতে নতুন আশা জেগেছিল। ধারণা ছিল, দীর্ঘদিনের নীতিগত জটিলতা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু এক বছর পার হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোনো সমস্যাগুলো রয়ে গেছে অবিকল; শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান অবনতি, বেহাল গবেষণা কার্যক্রম—সব কিছু আগের মতোই চলছে।
প্রশাসনিক স্তরে শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছিল। এই কমিশন
হাসিনা পতনের বর যখন নতুন সরকার দায়িত্ব নিল এবং বিভিন্ন কমিশ এ দেশের আপামর জনগণ আশায় বুক বেঁধেছিল নতুন শিক্ষা কমিশন হবে তারা নতুন শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি সংযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপারিশ দেবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও কমিশন গঠনের উদ্যোগ কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ফলে শিক্ষা সংস্কারের প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে শুরুই হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার নীতিগত ঘোষণা দিয়েছে, কিছু ছোটখাটো প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তবে তা মূল কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নীতিমালা নিয়ে অস্পষ্টতা, সমন্বয়ের অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন কোনো দিকনির্দেশনা তৈরি হয়নি।
এক বছরের অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে—শিক্ষা খাত অবহেলিত থাকলে দেশের ভবিষ্যৎও অবহেলিত হবে। সময় থাকতে গঠনমূলক পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা—সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই শিক্ষা সংস্কারকে আর কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে শিক্ষা খাতে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের বদলে স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা বেশি নজরে এসেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, দুর্নীতি ও মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি; বরং সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা কমিশন গঠন না করা। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠিত হলেও শিক্ষা খাতের জন্য আলাদা কমিশন হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষায় একটি পরামর্শক কমিটি গঠন হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। বরং প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ও কোটা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, যা শিক্ষায় বৈষম্যের শঙ্কা বাড়িয়েছে।
বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অবহেলা স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের শতকরা হার বাড়েনি, বরং প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ কমেছে। এর ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহে ঘাটতি রয়ে গেছে।
পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রে হঠাৎ পরিবর্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করেছে। নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের পাঠ্যক্রমে ফেরা এবং বই বিতরণে তিন মাসের বিলম্ব শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দীর্ঘ সময় চেয়ারম্যান ছাড়াই চলেছে, যা নীতি বাস্তবায়নে গতি আনতে পারেনি।
যদিও উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন এবং বেসরকারি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়, তবুও সামগ্রিকভাবে এক বছরে শিক্ষা খাতে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। বরং এই খাত এখনও কাঠামোগত সংস্কার, বাজেট বৃদ্ধি ও নীতিগত স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় আছে।
শিক্ষা কোনো দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাত বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের কার্যক্রমেও এই প্রবণতায় তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের শতকরা হার বাড়েনি; বরং প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ কমে গেছে। এই সংকোচন শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ—সবকিছুর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য। কিন্তু বরাদ্দ সীমিত থাকায় এসব খাতে বিনিয়োগ অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে এখনো শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষাসামগ্রীর অভাব, প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক এবং মানসম্মত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষায় জিডিপির কমপক্ষে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, যেখানে বাংলাদেশে তা ২ শতাংশেরও কম। এই অপ্রতুল বরাদ্দের ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশের অবনতি স্পষ্ট।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মূল সমস্যার সমাধান আনতে ব্যর্থ। বাজেট পরিকল্পনায় শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও গুণগত মানোন্নয়নের কৌশল অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এই খাত ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষা খাতে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা প্রসার ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা চালু করার জন্যও অপরিহার্য। তাই বাজেট বরাদ্দে অবহেলার এই প্রবণতা দূর না করলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠন অপরিহার্য। এই কমিশন শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে শিক্ষা কমিশন গঠনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি, যা বড় ধরনের নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১১টি কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা খাতের জন্য আলাদা কমিশন করা হয়নি। শুধু প্রাথমিক শিক্ষায় একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্য। এর ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, কমিশন ছাড়া শিক্ষা সংস্কার টেকসই হতে পারে না। কারণ, নীতিগত পরিবর্তন বা পাঠ্যক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি স্বতন্ত্র সংস্থার প্রয়োজন। কিন্তু কমিশন গঠন না হওয়ায় শিক্ষা খাতে পরিকল্পনাহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা আরও গভীর হয়েছে।
এ অবস্থায়, হঠাৎ নীতি পরিবর্তন যেমন—নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল, ২০১২ সালের পাঠ্যক্রমে ফেরা বা বৃত্তি পরীক্ষায় কোটা চালু—এসবই কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই বাস্তবায়িত হয়েছে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষা কমিশন গঠন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক পথনির্দেশ তৈরির প্রধান হাতিয়ার। তাই এই ব্যর্থতা কাটিয়ে দ্রুত কমিশন গঠনই এখন সময়ের দাবি, নইলে শিক্ষা সংস্কারের সুযোগ আবারও হাতছাড়া হবে।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় চালু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে পরীক্ষার নিয়মে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে—পঞ্চম শ্রেণির মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘কোটা ভিত্তিক’ আসন বরাদ্দ, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য আরও গভীর করবে।
কোটা ব্যবস্থার ফলে বিদ্যালয়গুলো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি মনোযোগ দেবে, বাকিরা থেকে যাবে উপেক্ষিত। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শিক্ষা ও চাকরিতে কোটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে। অথচ বৃত্তি পরীক্ষায় সেই বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার নীতি বিরোধী।
এ সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু প্রাথমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি শিক্ষার্থীদের মানসিকতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না, তারা ছোট বয়সেই ‘অযোগ্য’ বা ‘অপদার্থ’ হিসেবে নিজেকে ভাবতে শুরু করতে পারে। অন্যদিকে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত মনোযোগ একটি অসম শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করবে।
শুধু প্রাথমিক নয়, শিক্ষাবর্ষের সাত মাস পর অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা চালুর প্রস্তুতিও চলছে, যেখানে একই ধরনের কোটা ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা আছে। ফলে সমান সুযোগের বদলে শিক্ষার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ভিন্ন মাত্রার বিভাজন তৈরি করবে।
বৃত্তি পরীক্ষায় কোটা ও সীমিত অংশগ্রহণের এই নীতি পরিবর্তন শিক্ষা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। শিক্ষায় সমতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে হলে এসব বৈষম্যমূলক ধারা পরিহার করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে শিক্ষা খাতে বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক রদবদল ঘটেছে। নতুন উপদেষ্টা, কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট, যেমন—নীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, পাঠ্যক্রমে অস্থিরতা, বাজেট ঘাটতি ও শিক্ষক সংকট—অবিকল রয়ে গেছে।
গত মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সি আর আবরারকে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। তিনি ১২৩টি পাঠ্যপুস্তক যাচাই ও সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও মাধ্যমিকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। ২০২৭ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরিমার্জিত পাঠ্যক্রম চালুর কথা বলা হলেও এর জন্য আনুষ্ঠানিক কমিটিই গঠন করা হয়নি।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, অথচ গত মার্চ থেকে এটি চেয়ারম্যানবিহীন অবস্থায় চলছে। একজন সদস্য অতিরিক্ত দায়িত্বে চেয়ারম্যানের পদ সামলাচ্ছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বই প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণে বিলম্ব ঘটেছে।
প্রশাসনিক রদবদল সঠিক সময়ে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে হলেও যদি কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হয়, তাহলে কার্যকর পরিবর্তন আসে না। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, নীতি স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা। কেবল পদে পরিবর্তন এনে যদি সেই পরিকল্পনার অভাব পূরণ না করা যায়, তবে পরিবর্তনের সুফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ কেউই পাবে না। তাই প্রশাসনিক রদবদলের সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের শিক্ষা খাতের কার্যক্রম নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হতাশা স্পষ্ট। তাদের মতে, সরকার কিছু আংশিক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষা কমিশন গঠন, বাজেট বৃদ্ধি, পাঠ্যক্রমে স্থিতিশীলতা এবং ন্যায্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, “আমরা আশাভঙ্গ, এটাই মূল কথা।” তিনি মনে করেন, নতুন সরকার নানা বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও শিক্ষায় কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে একটি কমিটি হয়েছে, তাদের সুপারিশও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনা করা হয়নি। ফলে শিক্ষা খাত এখনও নীতি ও কাঠামোগত দিক থেকে স্থবির অবস্থায় আছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বৃত্তি পরীক্ষায় কোটা ব্যবস্থা চালুর সমালোচনা করে বলেন, গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শিক্ষা ও চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। অথচ প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সেই বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার নীতির পরিপন্থী।
বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার স্বীকার করেন যে, এখন পর্যন্ত কিছু বড় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি, তবে আগামী পাঁচ-ছয় মাসে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে বেগবান করার আশা রাখছেন। তিনি বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের সার্বিক অভিমত হলো—শিক্ষা খাতকে সঠিক পথে নিতে হলে দ্রুত কমিশন গঠন, বাজেট বৃদ্ধি, নীতি স্থিতিশীলতা এবং সমন্বিত সংস্কার জরুরি। তা না হলে এক বছরের মতো আরও সময় পেরিয়ে যাবে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি হবে না, আর শিক্ষা খাত থেকে যাবে কাগজে-কলমের সংস্কারের গণ্ডিতেই।
একদিকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও হয়েছে। যেমন—উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি। তবে কাঠামোগত সংস্কার, পাঠ্যক্রম হালনাগাদ এবং সমন্বিত নীতি প্রণয়নে এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এক বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—শিক্ষা খাতকে কেবল কাগজে-কলমে সংস্কার হিসেবে রাখলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাই অবিলম্বে কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠন, বাজেট বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল নীতি প্রণয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা ।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৩/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
