নিজস্ব প্রতিবেদক।।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বঞ্চিত দাবি করে বিভিন্ন দাবিতে সচিবালয়ের ভেতরে বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ-সমাবেশ লেগেই রয়েছে। সর্বশেষ সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
একই সঙ্গে এনবিআরকে দুই ভাগ করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুইটি স্বতন্ত্র বিভাগ করে অধ্যাদেশ জারির প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সরকার দফায় দফায় আহ্বান জানিয়েও আন্দোলন থেকে তাদের সরাতে ব্যর্থ হওয়ার পর এনবিআরের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরেই ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি ‘প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। এ ছাড়া আন্দোলন থেকে পিছু হটে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার হঠাৎ করেই কঠোর হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুদকের মামলা এবং ওএসডি হওয়ার আতঙ্ক শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিলুপ্তির অধ্যাদেশ জারির প্রতিবাদে এনবিআর ভবনে কয়েক দিন কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন শেষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামেন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের নেতারা। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরও আন্দোলনকারীরা এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে অটল থাকেন এবং সংস্থার কার্যালয়ে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন।
দাবি আদায়ে গত শনিবার থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করায় স্থবির হয়ে পড়ে আমদানি-রফতানিসহ এনবিআরের কার্যক্রম। কিন্তু সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আপস না করে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় দুদুক। এর পরেই কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে রোববার কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।
অন্যদিকে ২২ মে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন হওয়ার পর থেকেই এটি প্রত্যাহারের দাবিতে সচিবালয়ের ভেতর বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরাম। সচিবালয়ে কর্মরত কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের এ জোট দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তাদের আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়।
ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের একাংশের সভাপতি মো. বাদিউল কবীর ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই ‘কালো’ আইন বা অধ্যাদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এ আইন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে চলমান কর্মসূচি সমাপ্ত হবে। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে গত দুই দিন ধরে আন্দোলন থেকে পিছু হটেছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তবে ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান মো. বাদিউল কবীর জানান, দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ায় তারা আন্দোলনের ধরন পরিবর্তন করেছেন। রাজপথে মিছিল-সমাবেশ বা কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচি থেকে সরে এলেও সরকারের উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি দাওয়া তুলে ধরছেন। সোমবারও তারা অর্থ সচিবের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরেছেন।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার পদে পদে দুর্বলতার পরিচয় দেওয়ায় যারা চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সভা সমাবেশ করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন অনেকে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কঠোর হলে প্রশাসনে আরও আগেই শৃঙ্খলা ফিরে আসত।
সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা সেখানে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সচিবালয়ের কাজকর্ম ও পুলিশের কাজকর্ম সব জায়গায় অস্থিরতা। কারণ সরকার নেতৃত্ব দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ।
তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চাকরির আচরণবিধি রয়েছে। কেউ সেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিভাগীয় মামলাসহ কী কী শাস্তি হবে তা বলা আছে। আবার যদি কেউ ফৌজদারি অপরাধ করে তা হলে ফৌজদারি আইনে তার বিচার হবে। এটা সব নাগরিকের জন্য যে নিয়ম সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মচারীর মানসিকতা হওয়া উচিত দেশের সংবিধান, আইন ও বিধি মেনে জনগণের সেবা করা। কিন্তু এ মানসিকতা কারও কারও মধ্যে নেই। মানসিকতা কতটুকু পজেটিভ সেটা দেখতে হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার বিচার হতে হবে। বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অনেককে আইন লঙ্ঘনে উৎসাহিত করে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর যেকোনো বিধান লঙ্ঘন ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর আওতায় অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো সরকারি কর্মচারী এ বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অসদাচরণের দায়ে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আওতায় আসবেন। সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলাবহির্ভূত আচরণের বিষয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। কেউ সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত রাতের ভোটের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা ৪৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি এবং ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার পর প্রশাসনে আওয়ামীপন্থি আমলাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়।
এ ছাড়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। পাঁচ সদস্যের এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে। এ কমিটি গঠন হওয়ার পর নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/০৭/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল