নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বহুল আলোচিত-সমালোচিত সকালে পরীক্ষা নিয়ে রাতেই ফল প্রকাশ করা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের পর এবার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে গত “স্কুল-কলেজের অনিয়ম ধরা ডিআইএ’র বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে।
মঙ্গলবার (১৭ জুন) নিয়োগ পরীক্ষার মূল ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটির প্রধান করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন শাখার (উন্নয়ন অধিশাখা-২) যুগ্মসচিব মোহাম্মদ বরাদ হোসেন চৌধুরীকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন মন্ত্রণালয়ের সরকারি কলেজ শাখার (সরকারি কলেজ-৫) উপসচিব মো: আ: কুদদূস এবং প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব জাবের মোঃ সোয়াইব। তাদের আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ডিআইএ’র বহুল বিতর্কিত যুগ্ম পরিচালক আবুয়াল কায়সারকে বদলি
জানা গেছে,, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিটর, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহায়ক এই চার পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় চলতি মাসের ৯ তারিখ সকালে রাজধানীর তিনটি কেন্দ্রে। সকালে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা ৩ হাজার ১০৫ প্রার্থীর খাতা মূল্যায়ন করে সেদিন রাতেই ফল প্রকাশ করা হয়। এতে উত্তীর্ণ হন ১৫২ জন। ডিআইএ কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাপনায় থাকায় এবং রকেট গতিতে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করায় এই নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে।
ডিআইএর বর্তমান পরিচালকের চাকরির মেয়াদ দুই মাসেরও কম থাকায় দ্রুত নিয়োগ চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। অভিযোগ আছে, এবারের ডিপিসি কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন শিক্ষা পরিদর্শককে, যেখানে সাধারণত দায়িত্ব পান উপপরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
লিখিত পরীক্ষায় অংশ্রগ্রহণ করে ভালো পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেনি অনেক প্রার্থী। তারা অভিযোগ করে শিক্ষাবার্তা’কে বলেছিলেন, এই পরীক্ষায় কারা উত্তীর্ণ হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাই তারা ভালো পরীক্ষা দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকায় তাদের নাম আসেনি।
মোঃ হাফিজুল ইসলাম নামের এক প্রার্থী শিক্ষাবার্তা’কে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করব সেই আশায় ডিআইয়ের অডিটর পদে আবেদন করেই অন্যান্য চাকরির অনুশীলন বাদ দিয়ে শুধু এই পরীক্ষা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কুষ্টিয়া থেকে রাতের বাসে এসে সকালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরীক্ষা দিয়েছি। আমার আগের সব পরীক্ষার তুলনায় এই পরীক্ষা ভালো হয়েছে। অথচ সকালে পরীক্ষা দিয়ে কুষ্টিয়ায় ফিরতে ফিরতেই শুনি লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। পরে রোল নম্বর মিলিয়ে দেখি আমার রোল নম্বর নেই। এত ভালো পরীক্ষা দিয়েও লিখিত পরীক্ষায় আমাকে উত্তীর্ণ করানো হয়নি। পাতানো পরীক্ষা না হলে অবশ্যই আমরা উত্তীর্ণ হতাম। এই স্ক্যামের সাথে জড়িতদের আমরা শাস্তি চাই। যেন এরকম কেউ করতে না পারে।
সেসময় একাধিক প্রার্থীদের সাথে কথা হয় শিক্ষাবার্তা’র। তারা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মত একটি জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি দপ্তর পুরো পাতানো পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করলো। এগুলো শেখ হাসিনা সরকারের আমলে হয়েছে। এই সরকারের আমলেও যদি এইরকম হয় তাহলে আমরা চাকরি প্রার্থীরা মেধার যোগ্যতায় কিভাবে চাকরি আশা করব। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত চাই আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে জানিয়েছিলেন, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতেই ফল প্রকাশে এত তড়িঘড়ি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানতে পেরে এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
ডিআই কর্মকর্তারা বলেন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী কাম ক্যাশিয়ার, রেকর্ড কিপার, স্টোর কিপার, ফটোকপি অপারেটর, গাড়িচালক ও নিরাপত্তাপ্রহরীর এই সাত পদে লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ২৩ মে। পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সব মিলিয়ে ডিআইএর ১১ পদে মোট আবেদন করেন ২৪ হাজার ১১২ জন চাকরিপ্রার্থী। তবে এই নিয়োগেও আগে থেকে “প্রার্থী সিলেক্ট” থাকার অভিযোগে এই পরীক্ষাও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থগিত করা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষা স্থগিতের ব্যাপারে জানিয়েছিলেন বলেন, ডিআইএর লিখিত পরীক্ষার অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে তারা নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা তিন কর্মকর্তা শোকজ করে। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু মৌখিক নয়, বাকি থাকা সাত পদের লিখিত পরীক্ষাও স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। কবে নাগাদ এই পরীক্ষা হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তারা।
যেহেতু অনিয়ম হয়েছে এই পরীক্ষা নতুন করে নেওয়া হবে কি’না এবং ৩য় কোনো মাধ্যমে এই পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণনয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়ন করা হবে কি’না জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। পরীক্ষার দায়িত্ব থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি’না প্রশ্ন করলে এই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জোর আলোচনা চলছে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, ডিআইএ নিয়োগের জন্য প্রথম বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২১ মে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১০ ধরনের পদে মোট ৩০ জনকে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ১১ ধরনের পদে ৩৩ জনকে নিয়োগের কথা উল্লেখ ছিল। এসব পদের জন্য আবেদন করেন ২৪ হাজার ১১২ চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু স্বল্প সময়ে পরীক্ষা হওয়ায় অংশ নেয় ৩ হাজার ১০৫ চাকরিপ্রার্থী। ওইদিন রাতেই সব চাকরিপ্রার্থীর খাতা মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক প্রার্থী।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৭/০৬/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
