নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে চলছে তুঘলকি কাণ্ড। গত ৯ মে চার পদে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়, এদিন রাতেই ৩,১০৫ প্রার্থীর খাতা দেখে ফল ঘোষণা করে অধিদপ্তরটি। সকালে পরীক্ষা নিয়ে রাতে ফল ঘোষণা করা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা এবং সাত পদের লিখিত পরীক্ষাও এবার মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সারাদেশের স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগের অনিয়ম ধরার এই প্রতিষ্ঠানটির লিখিত পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের ঠিক আগের রাতে তা স্থগিত করে অধিদপ্তরটি। ডিআইএ কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাপনায় থাকায় এই নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (১৯ মে) পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ম-পরিচালক অধ্যাপক খন্দকার মাহফুজুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের ২১ এবং ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অডিটর পদে আগামী ২০ মে ও অফিস সহায়ক পদে আগামী ২১ মে তারিখে অনুষ্ঠিতব্য মৌখিক পরীক্ষা এবং অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী-কাম-ক্যাশিয়ার, রেকর্ড কিপার, স্টোর কিপার, ফটোকপি অপারেটর, গাড়িচালক ও নিরাপত্তাপ্রহরী পদে আগামী ২৩ অনুষ্ঠিতব্য লিখিত পরীক্ষা অনিবার্য কারণে স্থগিত করা হলো। এতে আরও বলা হয়, স্থগিতকৃত পরীক্ষার সময়সূচি পরবর্তীতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এবং প্রার্থীদের স্ব স্ব মোবাইল ফোন নম্বরে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে।
জানা গেছে,, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিটর, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহায়ক এই চার পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় চলতি মাসের ৯ তারিখ সকালে রাজধানীর তিনটি কেন্দ্রে। সকালে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা ৩ হাজার ১০৫ প্রার্থীর খাতা মূল্যায়ন করে সেদিন রাতেই ফল প্রকাশ করা হয়। এতে উত্তীর্ণ হন ১৫২ জন। ডিআইএ কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাপনায় থাকায় এবং রকেট গতিতে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করায় এই নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে।
লিখিত পরীক্ষায় অংশ্রগ্রহণ করে ভালো পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেনি অনেক প্রার্থী। তারা অভিযোগ করে বলেন, এই পরীক্ষায় কারা উত্তীর্ণ হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাই তারা ভালো পরীক্ষা দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকায় তাদের নাম আসেনি।
মোঃ হাফিজুল ইসলাম নামের এক প্রার্থী শিক্ষাবার্তা’কে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করব সেই আশায় ডিআইয়ের অডিটর পদে আবেদন করেই অন্যান্য চাকরির অনুশীলন বাদ দিয়ে শুধু এই পরীক্ষা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কুষ্টিয়া থেকে রাতের বাসে এসে সকালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরীক্ষা দিয়েছি। আমার আগের সব পরীক্ষার তুলনায় এই পরীক্ষা ভালো হয়েছে। অথচ সকালে পরীক্ষা দিয়ে কুষ্টিয়ায় ফিরতে ফিরতেই শুনি লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। পরে রোল নম্বর মিলিয়ে দেখি আমার রোল নম্বর নেই। এত ভালো পরীক্ষা দিয়েও লিখিত পরীক্ষায় আমাকে উত্তীর্ণ করানো হয়নি। পাতানো পরীক্ষা না হলে অবশ্যই আমরা উত্তীর্ণ হতাম। এই স্ক্যামের সাথে জড়িতদের আমরা শাস্তি চাই। যেন এরকম কেউ করতে না পারে।
একাধিক প্রার্থীদের সাথে কথা হয় শিক্ষাবার্তা’র। তারা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মত একটি জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি দপ্তর পুরো পাতানো পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করলো। এগুলো শেখ হাসিনা সরকারের আমলে হয়েছে। এই সরকারের আমলেও যদি এইরকম হয় তাহলে আমরা চাকরি প্রার্থীরা মেধার যোগ্যতায় কিভাবে চাকরি আশা করব। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত চাই আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতেই ফল প্রকাশে এত তড়িঘড়ি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানতে পেরে এই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
ডিআই কর্মকর্তারা বলেন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী কাম ক্যাশিয়ার, রেকর্ড কিপার, স্টোর কিপার, ফটোকপি অপারেটর, গাড়িচালক ও নিরাপত্তাপ্রহরীর এই সাত পদে লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ২৩ মে। পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সব মিলিয়ে ডিআইএর ১১ পদে মোট আবেদন করেন ২৪ হাজার ১১২ জন চাকরিপ্রার্থী। তবে এই নিয়োগেও আগে থেকে “প্রার্থী সিলেক্ট” থাকার অভিযোগে এই পরীক্ষাও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থগিত করা হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিআইএর লিখিত পরীক্ষার অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে তারা নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা তিন কর্মকর্তা শোকজ করে। শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু মৌখিক নয়, বাকি থাকা সাত পদের লিখিত পরীক্ষাও স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। কবে নাগাদ এই পরীক্ষা হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তারা।
যেহেতু অনিয়ম হয়েছে এই পরীক্ষা নতুন করে নেওয়া হবে কি’না এবং ৩য় কোনো মাধ্যমে এই পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণনয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়ন করা হবে কি’না জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। পরীক্ষার দায়িত্ব থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি’না প্রশ্ন করলে এই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জোর আলোচনা চলছে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে যুগ্ম পরিচালক খন্দকার মাহফুজুল আলম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, কি কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে আমার জানা নেই। আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে আমরা স্থগিত করেছি। লিখিত পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২০/০৫/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
