এইমাত্র পাওয়া

তাহামিনা আফরোজ’র গল্প: ফিরে দেখা

তাহামিনা আফরোজ :

র থেকে আওয়াজ এলো, শুনছ আজ কিন্তু তোমার মেজ জামাই আসবে। যাও বাজারে গিয়ে ভালো ভালো বাজার করে নিয়ে আসো। যাচ্ছি বলে, আব্দুল রহিম শেখ বাজারে চলে গেল। একদিকে আব্দুল রহিম শেখ চলে গেল,  অন্যদিক থেকে একজন গেটের ভেতর ঢুকলো। অর্ধ বয়সি একজন পুরুষ ও সাথে ১২/১৩ বছরের একটি মেয়ে। তারা ঘরে ঢুকলো। অর্ধ বয়সী পুরুষ এ বাড়ির মেজ জামাই মোঃ দেলোয়ার হোসেন আর সাথে তার মেয়ে মিনা আক্তার। ঘরে ঢুকে মিনা তার নানু সফুরা বেগম কে জড়িয়ে ধরল।

মিনা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। গ্রীষ্মের ছুটি বেড়াতে এসেছে নানা বাড়ি। তারা গোপালগঞ্জ থাকে। বাবা মোঃ দেলোয়ার হোসেন সরকারি চাকরি করে। তাই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় তাদের অবস্থান। দুপুরে খাও-দাওয়া শেষে, মোঃ দেলোয়ার হোসেন শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে বিদায় নেয়। সে এসেছিল বিশেষ এক কাজে। মেয়ে বায়না করে বেড়াতে যাবে। তাই সাথে নিয়ে আসা। আজ নিজের বাড়িতে গিয়ে থাকবে। কাজ সেরে পরদিন চলে যাবে গোপালগঞ্জ। মিনা কিছুদিন নানা বাড়ি থাকবে।

মিনার ছোট খালা রত্না আক্তার। মিনার সাথে খুব ভাব। মিনা শান্ত প্রকৃতির। কিন্তু গ্রাম্য পরিবেশ তার খুব প্রিয়। গ্রামে আসলে সে চঞ্চল হয়ে উঠে, কখন ঘুরে বেড়াবে। সুযোগ পেয়ে দুজনেই ঘর থেকে বের হয়ে যায়। কোথায় ফুলের বাগান, ফলের বাগান ঘু্রে ফিরে  একাকার। সারাদিন ঘুরে বেড়িয় ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যায় ঘুম। বিদ্যুৎ বিহীন গ্রাম। সন্ধ্যা হলেই যেন সমস্ত গ্রাম নিস্তেজ হয়ে পড়ে। জোনাকি পোকার আলো আর ঝি ঝি শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ পাওয়া যায় না।

 একদিন মিনা ও তার খালামণি ঘাটে পানি আনতে যাচ্ছিল। ১৯/২০ বছরের এক যুবক পিছন থেকে খালামণি বলে ডাকলো। খালামণি ওকে দেখে জিজ্ঞেস করল, কিরে হাসান কোথায় যাচ্ছিস? হাসান বলল, বাজারে যাচ্ছি। তোমার সাথে ওই সুন্দরী কে? মিনা একটু লজ্জা পেল। খালামণি উত্তরে বলেছিল, ও মিনা! মেজ আপার মেয়ে। বেড়াতে এসেছে। কেন তুই ওকে চিনিস না? হাসান বলল, না। এই প্রথম দেখলাম।

পরদিন মিনা ও খালামণি পুকুর ঘাটে বসে ছিল। হাসান দূর থেকে এসে কি যেন খালামণির কাছে দিয়ে চলে গেল। খালামণি মিনা কে বলল, দেখতো এটা কি দিল! মিনা হাতে নিযয় দেখল- বড় একটা পৃষ্ঠা। তাতে অনেক কিছুই লেখা। খালামনি পড়তে বললে ,মিনা পড়া শুরু করল, লেখাটা ছিল প্রেমের চিঠি। মিনা লেখাপড়ায় ভালো ছিল। বরাবরই সে ক্লাসে প্রথম হত। ভাল ছাত্ররা স্বভাবতই একটু বোকা টাইপের থাকে। এই প্রেম-টেম কম বুঝে। যাই হোক, চিঠি পড়ে মিনার খুব রাগ হল। খালামণি বুঝিয়ে মিনাকে ঠান্ডা করলো।

চিঠি দেওয়ার পর থেকে হাসান মিনার পিছন ছাড়লনা। মিনা যেখানেই যেত, হাসান ছায়ার মত সেখানে উপস্থিত। অসহ্য হয়ে মিনা খালামণিকে বলল, আমি চলে যাব। খালামণি বলল, শোন হাসান বলেছে তুই যদি ওকে চিঠির উত্তর দিয়ে দিস, তাহলে আর তোকে জ্বালাতন করবে না। কোথাও কোন কাগজ নেই। কোন রকম একটা পুরনো কাগজে খালামণির শেখানো কথা লিখে দিল মিনা। কিন্তু এরপর হাসান আরোও বেশি বিরক্ত শুরু করে দিল।

একদিন মিনা ওর বড় মামার ঘরে গেল। চলে আসবে তখনই হাসান উপস্থিত। ঘরে ঢুকে মিনার পথ আটকাল হাসান। মিনার হাত ধরল। আমাকে ছাড়েন, আমাকে ছাড়েন, বলতে লাগলো মিনা। হাসান বলল, একবার বলো আমি তোমায় ভালোবাসি। না আমি বলবো না, মিনা বলল। না বললে আমি তোমায় ছাড়বোনা। হাসান আরো জোরে হাত ধরল। আমি বলছি আগে বল ভালোবাসি। মিনা বড় বিপদে, কি করবে না বুঝে পালানোর জন্য বলে ফেলল, ভালোবাসি। অবাক হয়ে হাসান হাত ছেড়ে দেয়। মীনা দৌড়ে পালায়।

হাসানের পাগলামি দেখে মিনার মনটা একটু নরম হয়। মনে মনে একটু ঠাই দেয় ওকে। হাসান দেখা করতে চায় মিনার সাথে। মিনাও এখন তেমন বিরোধিতা করে না। তাদের মধ্যে কেমন একটা বন্ধন তৈরী হয়ে যায়। হাসান একদিন মিনাকে ডেকে পাঠায়। মিনাও হাসানের সাথে দেখা করে। হাসান বলে আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। তুমি আমাকে ভালোবাসো মিনা? মিনার বয়স কম। তাই একটু লজ্জা পেল। মুখে কিছুই বলল না। মিনার লজ্জা রাঙা মুখখানি সব প্রকাশ করে দিল।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হয়ে গেল। এবার যাওয়ার পালা। মিনার বাবা আসবে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। হাসানের মন অনেক খারাপ। আর বুঝি দেখা হবেনা। মীনা যাকে সহ্য করতে পারত না, আজ তার জন্য মিনার কেমন যেনো কষ্ট হচ্ছে। মিনা খালামণিকে কষ্টের কথা জানায়। খালামণি বলে, একেই বলে ভালোবাসা।

কাল চলে যাবে মিনা। তাই ওরা দুজন দেখা করে। হাসান বলে মিনা আমাকে ভুলে যাবে নাতো! আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।  জানো মিনা তুমি বলে ছিলে, বড় হয়ে তুমি ডাক্তার হবে। আমি তোমাকে ডাক্তার বানাব। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। আর আমি শিক্ষক হব। মিনা জিজ্ঞেস করেছিল কেন তুমি শিক্ষক হবে? হাসান উত্তর দিয়েছিল, যেহেতু তুমি ডাক্তার হবে, তাই আমি শিক্ষক হব। কারণ এই দুটি পেশা হলো সেবামূলক কাজ আমরা দুজনে আদর্শ পেশা বেছে নিলাম।

আমি কাল চলে যাব। তোমার সাথে কি আর দেখা হবে? হাসান বলল, জানিনা কবে দেখা হবে। তবে আমি তোমার অপেক্ষায় সারা জীবন থাকবো। এত দূরের পথ, কিভাবে যোগাযোগ করবো? তবে মনে রেখো আমার ভালবাসায় কোন খাদ নেই। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা্র একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। পরদিন মিনা তার বাবার সাথে চলে গেল।

অনেকদিন পর, মিনার মা অসুস্থ। দেখাশোনা করার জন্য লোক প্রয়োজন। তাই মোঃ দেলোয়োর হোসেন মিনার খালামণি রত্নাকে আসার জন্য খবর পাঠাল। একথা শুনে মিনা খুশিতে আত্মহারা। কেননা এবার হাসানের খবর পাওয়া যাবে। কত দিন হাসানের সাথে যোগাযোগ নেই মিনার। হাসানের একট খবর নেয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে মিনা।

খালামণি এলো। সবাইকে নিয়ে ব্যাস্ত। মিনা সুযোগ খুঁজছে, কখন খালামণিকে একবার একা পাবে। কখন হাসানের খবর নিবে। অবশেষে খালামণিকে একা পেল মিনা। মিনা খালামণিকে জিগ্যেস করল, খালামণি হাসান কেমন আছে? খালামণি একটা চিঠি বের করে দিল মিনাকে। খালামণির মলিন মুখ দেখে মিনা চিন্তিত হয়ে পরল। দ্রুত চিঠি বের করে পড়তে লাগল।

প্রিয় মিনা,

            তোমার পথ চেয়ে অপেক্ষার পালা শেষ। তোমার ওই সুন্দর মুখখানা দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। কিন্তু দেখতে পারবো কিনা জানিনা। ভেবে ছিলাম তোমাকে নিয়ে সারা জীবন কাটাব। স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু ভাগ্য আমার বৈরী। আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে । আমার চিঠি যখন তোমার কাছে পৌঁছাবে, তখন হয়তো আমি তোমার থেকে অনেক দূরে। ইচ্ছে করলেই আমাকে আর পাবে না। আর আমার জন্য কষ্ট পেয়োনা । তুমি ভালো থেকো । তুমি ভালো থাকলেই আমি শান্তি পাবো। তোমার মাঝেই আমি বেঁচে থাকব।

                                                                                                        তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী

                                                                                                                   হাসান

মিনা বলল, খালামণি হাসান কোথায়? খালামণি বলল, হাসান পৃথিবীতে আর নেই। হু হু করে উঠলো মিনার হৃদয়। দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে। ঠোট দুটো থর থর করে কাপছে। কান্নায় ভেঙে পড়ল মিনা। আনমনে আকাশে তাকিয়ে রইল মিনা।

 অনেক বছর পর…….

ছুটির ঘন্টা বাজল। মিনা ব্যাগ কাঁধে বিদ্যালয় থেকে বের হল। গ্রাম্য আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে হাঁটছিল । ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে দেখল মিনা। আবার ব্যাগের ভেতর রেখে দিল। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে আবার হাঁটতে শুরু করল।

“আজ আমি তোমার একটি আশা পূর্ণ করতে পেরেছি, তোমার বড় ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হবে, শিক্ষকতা পেশা কে তুমি আদর্শ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলে। তুমি আজ নেই, কিন্তু তোমার সেই আদর্শকে ধরে রাখার জন্য আমি বেঁচে আছি, একজন শিক্ষক হয়ে। তুমি বলেছিলে আমার মাঝেই তুমি বেঁচে থাকতে চাও। আমি তোমার আদর্শকে ধরে রাখবো। তোমার আদর্শ নিয়ে আমি সারা জীবন বেঁচে থাকবো । জীবনে একটি আফসোস রয়ে গেল, ফিরে দেখা হলো না আর !”

 

লেখক : তাহামিনা আফরোজ, সহকারি শিক্ষক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.