এইমাত্র পাওয়া

গ্রামীণ ব্যাংকে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন কমবে সরকারের কর্তৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক।। নোবেলজয়ী ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারের অংশীদারত্ব ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ ৩ জন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার সরকারি ক্ষমতা কমিয়ে সরকারের জন্য মাত্র একজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩ সংশোধনের একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে সরকারের পরিবর্তে ১২ সদস্যের বোর্ড গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচন করবে। এতে প্রতিষ্ঠানটির স্বায়ত্তশাসন সুদৃঢ় হবে। নতুন এই উদ্যোগের ফলে গ্রামীণ ব্যাংকে ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে ও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে সরকারের হস্তক্ষেপ কমবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে ২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। অবসরের বয়স পেরিয়ে গেছে, এমন যুক্তি দেখিয়ে তাকে সে সময় পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল ফ্যাসিস্ট সরকার।

জানা গেছে, ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ছিল ২৫ শতাংশ। তবে পরবর্তী সরকারগুলো পরিশোধিত মূলধনে অবদান না রাখায় এ অংশীদারি ধীরে ধীরে ৫-৮ শতাংশে নেমে আসে। ২০১১ সালে মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণের সময় সরকার ২৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডিং পুনঃস্থাপনের জন্য মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।

গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের ২৫ শতাংশ মালিকানা সরকারের এবং বাকি ৭৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতাদের। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ঋণগ্রহীতাদের কাছে ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন খসড়া অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হবে। ঋণগ্রহীতারা ধীরে ধীরে মূলধনে অবদান বাড়িয়ে ৯৫ শতাংশ মালিকানা অর্জন করবেন।

পরিচালনা পর্ষদ ঘোষিত যে কোনো লভ্যাংশ মূলধনের ভিত্তিতে আনুপাতিকভাবে বিতরণ করা হবে। সূচনালগ্ন থেকেই গ্রামীণ ব্যাংকের ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ সরকারের মনোনীত তিনজন পরিচালক এবং ঋণগ্রহীতাদের নির্বাচিত নয়জন পরিচালক রয়েছেন। নতুন প্রস্তাবে ঋণগ্রহীতারা বোর্ডে ১১ জন পরিচালক নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। বর্তমান আইনে বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে রয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত খসড়ায় চেয়ারম্যান নির্বাচন বোর্ডের সদস্যদের মধ্য থেকেই করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান আইনে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে সরকার তার মনোনীত দুই পরিচালকের মধ্যে একজনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। প্রস্তাবিত খসড়ায় এ বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান অক্ষম হলে বোর্ডের সদস্যরা অন্য কোনো পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমোদন দিতে পারবেন।

বর্তমান আইনের অধীনে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। প্রস্তাবিত খসড়ায় এ বিধান বহাল রাখা হয়েছে। তবে এতে নতুন একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছেÑ বোর্ডের অনুমোদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৬৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে, যদি ব্যাংকের কার্যক্রমে তা প্রয়োজনীয় মনে হয়। বর্তমান আইনে পরিচালকদের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারিত রয়েছে এবং খসড়া অধ্যাদেশেও এটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে নতুন একটি সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘নবনির্বাচিত পরিচালকেরা তাদের দায়িত্ব গ্রহণ না করার আগ পর্যন্ত নির্বাচিত পরিচালকেরা তাদের পদে থাকবেন।’

এ ছাড়া বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন আঞ্চলিক অফিস খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু খসড়া অধ্যাদেশে এ শর্তটি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান আইনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জোবরা গ্রামে ড. ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের কোনো উল্লেখ নেই। তবে খসড়া অধ্যাদেশে আইনের ধারা ৪-এ একটি ব্যাখ্যা যুক্ত করে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প বলতে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধীনে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা গ্রামে পরিচালিত ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমকে বোঝায়। এ প্রকল্প পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পায় এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক এতে অংশগ্রহণ করে।

শিক্ষাবার্তা /এ/১০/০১/২০২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.