আজ মহান বিজয়ের দিন। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় আমাদের বাংলাদেশ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে মুক্ত হয় এদেশের মাটি ও মানুষ। একাত্তরে আমাদের দেশের জন্ম; জন্ম একটি পতাকা ও স্বতন্ত্র মানচিত্রের। আমরা যারা তরুণ, আমরা একাত্তর দেখিনি। দেখিনি প্রিয় মাতৃভূমির জন্মও। তবে পতাকা দেখেছি। রক্তে কেনা লাল সবুজের পতাকা। বাংলার আকাশে পতপতে ওড়তে থাকা স্বাধীন পতাকা। আমরা দেশকে ভালোবাসি। ভালোবাসি দেশের মাটি ও মানুষকে।
লাল সবুজের পতাকাকে। পতাকা স্বাধীন জাতিসত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বিজয়ের এই দিনে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সে সব শহীদ ভাইদের; একাত্তরে যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল সবুজ বাংলার পথ-ঘাট। নদীতে বয়েছিল রক্তবন্যা! যারা জীবন দিয়েছে একটি দেশের জন্য। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি স্বতন্ত্র মানচিত্রের জন্য। একটি স্বাধীন পতাকার জন্য।
লাল সবুজের পতাকা আমাদের অহঙ্কার। আমাদের গর্ব। পতাকার গাঢ় সবুজ রঙ বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির রূপকে প্রকাশ করে। রক্তের মতো লাল রঙ লাখো মানুষের শহীদ হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। যেন সবুজ নীলিমায় শহীদি খুনের শৈল্পিক আঁচড়! ইসলামে পতাকার মর্যাদা অসীম। রাসুল (সা.) পতাকা ভালোবাসতেন। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের সময় যখন প্রবেশ করছিলেন তখন তার পতাকার রঙ ছিল সাদা।’ (তিরমিজি)। মসজিদের হারামের পাশে অন্য একটি মসজিদের সামনে তিনি সেই পতাকা গেঁথে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে মসজিদের নাম রাখা হয় মসজিদে রায়াহা বা পতাকার মসজিদ।
সাহাবারাও পতাকার প্রতি অসীম সম্মান দেখিয়েছেন। ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখতে তারা যুদ্ধ করেছেন। মুক্তির সংগ্রাম করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। হজরত আবুল আব্বাস সাহল ইবনে সাদ সায়েদি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) খায়বার যুদ্ধের দিন বললেন, নিশ্চয় আমি আগামীকাল যুদ্ধের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে অর্পণ করব, যার মাধ্যমে আল্লাহ বিজয় দান করবেন, আর সে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তার রাসুলও তাকে ভালোবাসেন। তারপর সবাই রাতে এই আলোচনায় মগ্ন থাকল যেকোনো ব্যক্তির হাতে পতাকা অর্পণ করা হবে। ভোরে সবাই রাসুলের (সা.) কাছে সমবেত হলো।
প্রত্যেকেরই আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, পতাকা তার হাতে অর্পিত হোক। কিন্তু তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আলী ইবনে আবু তালেব কোথায়? বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! তার দুচোখে ব্যথা হচ্ছে। তিনি বললেন, তাকে ডেকে পাঠাও। সুতরাং তাকে ডেকে আনা হলো। তারপর রাসুল (সা.) তার চক্ষুদ্বয়ে থুথু লাগিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। ফলে তিনি এমন সুস্থ হয়ে গেলেন; যেন তার কোনো ব্যথাই ছিল না। অতঃপর তিনি তার হতে যুদ্ধের পতাকা অর্পণ করলেন।’ (মুসলিম : ১৮৯৪; আবু দাউদ : ২৭৮০; মুসনাদে আহমদ : ১২৭৪৮)। মুতার যুদ্ধে পতাকার প্রতি অসীম ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)। তখন শত্রু সৈন্যের তোপের মুখে পড়ে আঘাতে আঘাতে খান খান হয়ে যাচ্ছিলেন অনেক সাহাবি (রা.)।
কিন্তু পতাকা হাতে অনড় সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)। এক সময় প্রতিপক্ষের তলোয়ারের আঘাত লাগে তার ডান হতে। ভারী আঘাতে কেটে পড়ে পতাকাবাহী হাত। সাহাবি পতাকা ছাড়েননি। হাত বদল করে বাম হাতে পতাকা উড়ান। আঘাত আসে বাম হাতেও। সত্যের বিজয়ী পতাকা তখনও উড়ছে। এবার পতাকা উড়ছে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কনুই-পেটে। ক্রমেই বাড়ছে যুদ্ধের ভয়াবহতা। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। আক্রমণ উল্টো আক্রমণ। এক সময় পুরো হাতই শেষ। এবার সাহাবি পতাকা মুখে নিলেন। পতাকা উড়ছে সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মুখে। তবু পতাকা ছাড়েননি তিনি। (বুখারি : ২/৬১১) পতাকার প্রতি তার এই ভালোবাসা আমাদের প্রেরণার সোপান। আমরাও আমাদের জাতীয় পতাকাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি দেশের মাটি ও মানুষকে। আমাদের পতাকার সম্মান আমরাই ধরে রাখব। বাংলার আকাশে অনন্তকাল উড়াব লাল সবুজের পতাকা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
