অটোমেশনের নামে প্রাইভেট মেডিক্যালে চরম বিশৃঙ্খলা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তিতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। অটোমেশনের নামে প্রাইভেট মেডিক্যাল সেক্টর ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে। অটোমেশনের কারণে শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

এদিকে, বেসরকারি মেডিক্যাল চালু হাওয়ার পর সব সময় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ভর্তিতে পছন্দমতো মেডিক্যাল কলেজে মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পেয়ে আসছিলেন। পূর্বের ভর্তির নিয়ম অনুযায়ী সারা দেশে একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির পর প্রাইভেট মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ ছিল। এতে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারতেন। গত বছর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির ব্যাপারে বিস্ময়কর পরিবর্তন আনা হয়। মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের নামে সংশ্লিষ্টদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যে গত বছর অটোমেশন চালু করা হয়। এই পদ্ধতি চলতি বছর অব্যাহত রাখা হয়েছে। এতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। চলতি বছর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ১ হাজার ২০০ সিট খালি রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, খালি রয়েছে ৯০০। এদিকে গত দুই বছরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ভর্তিতে ২০ ভাগের ওপরে সিট খালি। এমনকি গরিব মেধাবী কোটায় ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে সরকারের একার পক্ষে সবার চিকিৎসা শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চিকিৎসা শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে। মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএমডিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এতগুলো বডি রয়েছে মান নিয়ন্ত্রণ দেখভালের জন্য। বেসরকারি হাসপাতাল অনুমোদনে সবকিছু ফুলফিল দেখেই লাইসেন্স দেওয়া হয়। নিয়মনীতি না মানলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেটা বাস্তবায়ন না করে বেসরকারিতে গুণগত মান নেই—এমন অভিযোগ তুলে অটোমেশন চালু করা হয়। অটোমেশনে বলা হয়েছে, একটা সিটের জন্য পাঁচজন ছাত্র থাকবে। মানে ২৫ হাজার সিরিয়ালের মধ্যে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি হতে পারবে। সিরিয়াল নম্বর ৪৯ হাজারের বেশি দিয়েও চলতি বছর এখনো ১ হাজার ২০০ সিট খালি আছে। এই অবস্থা দেখে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দাবির মুখে ভর্তির পোর্টাল খুলে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু কেউ যোগাযোগ করেন না। কোনো ছাত্রছাত্রী আসেন না। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও আসছেন না। অথচ অটোমেশন চালু করার আগে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মেডিক্যালে পড়তে আসতেন শিক্ষার্থীরা। কে কোথায় পড়বেন, তা লটারি নির্ধারণ করবে—এটা অটোমেশনের বিধান। এ কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না, দেশের শিক্ষার্থীরাও এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরে পড়তে চান, ঢাকায় আসতে চান না। আবার অনেকে ঢাকায় থাকতে চান। কিন্তু অটোমেশন কাউকেই খুশি করতে পারছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। আর ছাত্রছাত্রীদের ভর্তিতে অটোমেশনের নামে বড় বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এটা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা বলেন, অটোমেশন পদ্ধতি চালু করার নেপথ্যে কারণ হলো, বেসরকারি সেক্টর যেন দাঁড়াতে না পারে। ইতিমধ্যে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি সম্পন্ন হয়ে ক্লাস শুরু হয়েছে।

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর মালিকপক্ষ বলছেন, প্রাইভেট সেক্টর ধ্বংস করার জন্য অটোমেশন চালু করা হয়েছে। সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের ব্যবস্থাপনাও চাহিদার তুলনায় সীমিত। এই সুযোগে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে দুষ্টচক্র ভুল বুঝিয়ে অটোমেশন চালু করেছে। শিক্ষার মান রক্ষায় নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি অনেক নামীদামী বেসরকারি হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত কিংবা বেশির ভাগ বিত্তশালী এখন দেশেই চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি এম এ মুবিন খান বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ সেক্টর ধ্বংস করার নীলনকশা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে—প্রতিষ্ঠান গড়া কঠিন, ধ্বংস করা সহজ। প্রাইভেট সেক্টরে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা নিজের চয়েজমতো ভর্তি হবেন। কিন্তু অটোমেশনের কারণে তারা তা পারছেন না। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবাই হতাশ। হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে দেওয়ার মতো অবস্থায় অটোমেশন। যার জন্য এই পেশায় আসতে শিক্ষার্থীরা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। অটোমেশনের নামে এই সেক্টরকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি মেডিক্যাল সেক্টর মান নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা মানে না। টাকার বিনিময়ে ভর্তি করা হয়। এ কারণে মান নিয়ন্ত্রণ ও সত্যিকার অর্থে যারা মেধাবী, তাঁদের পড়ার সুযোগ করে দিতে অটোমেশন চালু করেছি। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নির্বাচনকৃত ভর্তিচ্ছু তালিকায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা ঢাকার বাইরে গ্রামে-গঞ্জের কোনো মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। আবার ঢাকার বাইরের অনেককেই রাজধানীসহ বড় বড় শহরে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, কিছু অযোগ্য, অদক্ষ ও ঘুষখোর কর্মকর্তার কারণে সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে।ইত্তেফাক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/জামান/২২/০৫/২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.