বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ম্যানেজিং কমিটি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার মালিক। তারা ‘পুরুষকে নারী আর নারীকে পুরুষে পরিণত করা’ কিংবা ‘দিনকে রাত আর রাতকে দিন করা’ ছাড়া অন্য সবই যেন করতে পারে। ফলে ম্যানেজিং কমিটির স্বেচ্ছাচারীতা ও স্বৈরাচারীতা কোন কোন জায়গায় এখন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে ম্যানেজিং কমিটির নানা দৌরাত্ম্যের কারণে আমাদের লেখাপড়ার যেমন বারটা বাজবে, তেমনি বছরে কোটি কোটি টাকা ম্যানেজিং কমিটির রাগব বোয়ালদের পেটে যাবে। এ সব টাকা দিয়ে সব স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণের ব্যয় নির্বাহ করা একান্তই সম্ভব। ম্যানেজিং কমিটি
কে প্রাধান্য না দিলে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে অসুবিধায় পড়তে হয়। তাদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের দিকে খেয়াল রাখতেই হয়। অনেক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে থাকে।
কোন কোন জায়গায় নাকি মাসিক বেতন বিলে স্বাক্ষর নিতে সভাপতিকে টাকা দিতে হয়। স্কুল-কলেজের তহবিল থেকে প্রয়োজনে টাকা উঠাতে সভাপতিকে নজরানা না দিলে চলে না। সচরাচর সর্বত্র না হলে ও অনেক জায়গায় এমনিই হয়।
ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন নিয়ে কোন কোন সময় দলাদলি ও গ্রুপিং-লবিং চলে। এ এক জটিল প্রক্রিয়া। দু’বছর পর পর কমিটি নির্বাচন নিয়ে এক মহা ঝামেলা পোহাতে হয়।কোন কোন স্থানে এ নিয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটে। প্রতিষ্ঠান প্রধান সহ অন্যান্য শিক্ষকরা এতে প্রচন্ড বিব্রত বোধ করেন। অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময়ের জন্য লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। এ নিয়ে কয়েক মাস আগে এক প্রধান শিক্ষককে খুন পর্যন্ত হতে হয়েছে ।
কোন কোন জায়গায় স্কুল-কলেজের তহবিলের প্রতি নজর থাকে কমিটির লোকজনের। প্রতিষ্ঠান প্রধান তাদের পছন্দ মতো হলে কথা নেই। তহবিল লুটপাটের কাজ চলে অনায়াসে । আর তিনি যদি তা না হন, তবে তাঁকে নানা ভাবে হেনস্তা হতে হয়। গালি গালাজ, কান ধরে উঠবস, জুতাপেটা ইত্যাদি তো আছেই।
ম্যানেজিং কমিটির অনেকেই জানেন না, তাদের কাজ কী? অনেক জায়গায় এরা শিক্ষকদের অযথাই বিপক্ষে লেগে থাকেন। নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তির কথা আমরা সবাই জানি। সেখানে নিয়োগ বাণিজ্য সহ অন্যান্য কয়েকটি বিষয়ে কমিটির সাথে প্রধান শিক্ষকের বনিবনা হচ্ছিল না। তাই তাঁর বিরুদ্ধে মিছেমিছি ধর্ম অবমাননার অজুহাত রটিয়ে তাঁকে কী অপমানটাই না করলো তারা !
লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জের গোপালরায় পঞ্চপথী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির কান্ডও আমাদের অজানা নয়। শুধু লালমনির হাট বা নারায়নগন্জ নয় সারা দেশেই একই অবস্থা।
একটা সময় ম্যানেজিং কমিটি স্কুল-কলেজের জন্য খুবই সহায়ক ছিল। শিক্ষিত না হয়ে ও অনেকে তখন শিক্ষার জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন । তাঁরা নিজের জমি-জিরাত বিক্রি করে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শিক্ষকদের বেতন দিয়েছেন নিজের পকেটের টাকায়। আজকাল এমন মানুষের সংখ্যা একেবারে নগন্য। এখন অনেকেই পদের লোভী। নিজের পকেট থেকে দু’টাকা খরচ করতে নেই। বরং পকেট ভারী করার জন্য কমিটির সদস্য হওয়া চাই।
একটা সময় ছিল যখন স্কুল-কলেজে সরকারের অংশীদারিত্ব নাম মাত্র ছিল । কোন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা লগ্নে তাতে জনসাধারণের অংশগ্রহণ বেশী ও স্বতঃস্ফূর্ত থাকে। তখনকার সময়ে ম্যানেজিংকমিটর অপরিহার্যতা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু, বর্তমানে স্কুল-কলেজ সমূহে সরকারের অংশ গ্রহণ বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকার স্কেলের শত ভাগ বেতন দেয়। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরকার লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে।উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা অফিসার ও একাডেমিক সুপারভাইজাররা থাকেন।অনলাইনে যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য যাচাই বাছাই করা যায়।
এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে সহকারি প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, উপাধ্যক্ষ, অধ্যক্ষ ও কর্মচারীদের নিয়োগ দিলে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও সুন্দর হয়। সরকার ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও উপবৃত্তি দেয়। তাহলে, এমতাবস্থায় ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা আর কী অবশিষ্ট থাকে?
শিবা/জামান/১৫/০৫/২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
