এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান: প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা (Primary Scholarship Exam.) হলো বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মেধাভিত্তিক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ট্যালেন্টপুল বা সাধারণ গ্রেড বৃত্তি পায়।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এতে করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা যাচাইয়ের সুযোগ পেত, আর্থিক সহায়তা পেত এবং একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করত। কিন্তু এখন যদি কেবলমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই এই সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে লক্ষ লক্ষ বেসরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কোমলমতি শিশুদের জন্য এই দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক সময় সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে। অথচ, সম্প্রতি সরকারের সিদ্ধান্ত—শুধুমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে—সে প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি সহশিক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং ন্যায়ের মূলনীতির বিপরীতে অবস্থান করছে।
একজন মেধাবী ছাত্র বেসরকারি স্কুলে পড়লেই কি তার বৃত্তির যোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়? শুধু প্রতিষ্ঠানের ধরণ দিয়ে বিচার করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এই সিদ্ধান্ত সরকারি-বেসরকারি বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলবে। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে।
বৃত্তি পরীক্ষা হলো একধরনের মেধার প্রতিযোগিতা। সেখানে সীমাবদ্ধতা তৈরি করা মানে মেধার বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত সিদ্ধান্ত, যাতে সরকারি বিদ্যালয়ের সাফল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো সম্ভব হয়।
একজন শিশু যখন শিক্ষালাভ করে, সে কেবল বই পড়েই বড় হয় না—সে স্বপ্ন দেখে, লক্ষ্য স্থির করে। তার জন্য একটি বৃত্তি যেমন সম্মানের, তেমনি উৎসাহের মাধ্যম। তাকে শুধুমাত্র স্কুলের ধরণ দেখে বঞ্চিত করা অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
সব শিক্ষার্থী জাতীয় পাঠ্যক্রমে পড়ছে। তাহলে শুধু সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।”
“আমাদের স্কুলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, যারা বৃত্তির উপযুক্ত। কিন্তু তারা কেবল স্কুলের ধরন অনুযায়ী বঞ্চিত হচ্ছে—এটা হতাশাজনক।” “বৃত্তি হওয়া উচিত মেধার ভিত্তিতে, প্রতিষ্ঠানের নয়”
“বৃত্তি কোনো দান নয়, এটা শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য। প্রতিষ্ঠানভেদে সুযোগ-সুবিধা ভাগাভাগি করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে।”
শিশুদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা উচিত নয়। সরকারি, বেসরকারি, মাদরাসা বা এনজিও স্কুল—সবখানেই শিশু পড়াশোনা করে। তাহলে শুধুমাত্র একটি শ্রেণির শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেওয়া কেন ? একজন মানুষ তার সন্তানকে কষ্ট করে সামান্য টিউশন ফি দিয়ে স্থানীয় বেসরকারি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন। অনেক সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংকট বা অব্যবস্থাপনার কারণে বেসরকারি স্কুলকেই ভালো মনে করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন—বৃত্তি মেধার স্বীকৃতি। সেটি সরকারি বা বেসরকারি যেখানেই হোক না কেন, যোগ্য শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
অনেক শিক্ষক নেতাদের অভিমত হলো—এই নিয়মটি শিক্ষা ক্ষেত্রে সমতা নষ্ট করে, মেধার প্রতি অবিচার করে এবং নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। তারা আশা করছেন সরকার এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করবে এবং শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখবে।
সবার জন্য শিক্ষা”—এই স্লোগানে আমরা গর্ব করি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সেই ‘সবার’ মধ্যে কি সত্যিই সবাই অন্তর্ভুক্ত? যখন বৃত্তির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ শুধুমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়, তখন তা একটি সুস্পষ্ট বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে। একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন এমন একটি মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে?
জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০” শিশুদের জন্য একটি ভবিষ্যত-গঠনমূলক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ, তাই তাদের জন্য এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন যা হবে সমান সুযোগসম্পন্ন, আনন্দময় ও নৈতিক মূল্যবোধে পরিপূর্ণ। শুধু সরকারী স্কুলের শিশুদের জন্য নিয়মটি প্রযোজ্য হলে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এর সাথে সাংঘষিক।
সরকারের উচিত শিক্ষা নীতিতে অন্তর্ভুক্তির নীতি বজায় রাখা, বর্জনের নয়। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিভাবান শিশুদের উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমকে সংকীর্ণ করে ফেলা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের পথেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সরকারের প্রতি আহ্বান, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগের নীতিতে ফিরে আসুন।
লেখক, প্রধান সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা ডটকম
শিক্ষাবার্তা /এ/১৮/০৭/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
