এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষাব্যবস্থার তদারকিতে স্থবিরতা: রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে—গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই তথ্য নিছক কোনো পরিসংখ্যানগত অবনমন নয়; বরং এটি শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি, জবাবদিহি ও সুশাসনের ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা যখন প্রতিনিয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন, তখন রাষ্ট্র কি কেবল নির্বিকার দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকবে?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) গঠিত হয়েছিল মূলত এই উদ্দেশ্যেই—দেশের এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও জাল সনদ শনাক্ত করা এবং সার্বিকভাবে শিক্ষার মান রক্ষায় ভূমিকা রাখা। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রায় ৩৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্বে থাকা এই অধিদপ্তরের কার্যক্রম আজ দৃশ্যত স্থবির। পরিদর্শন অর্ধেকে নেমে আসার অর্থ দাঁড়ায়—অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তারের পথ আরও প্রশস্ত হওয়া।

খোদ সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর অবস্থাও আজ কম সঙ্গিন নয়। জনগণের করের টাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা দেওয়া হলেও বহু প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর। অন্যদিকে বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষাবাণিজ্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নানান কৌশলে অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ ও নির্যাতন, কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন-নির্ভর শিক্ষা—সব মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষের প্রাণবন্ত শিক্ষার পরিবেশ প্রায় বিলুপ্ত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হলে বহু অন্ধকার দিক দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্যায়-অনিয়ম উচ্ছেদের কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি। শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তাও যেন নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান পায়নি। এরই মধ্যে শিক্ষা প্রশাসনে ঘুষ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন নয়। পাঠ্যপুস্তক বিতরণে প্রতি বছর বিলম্ব, থানা শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে আঞ্চলিক অফিস, শিক্ষা ভবন ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখায় ঘুষের অভিযোগ—সব মিলিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ ১৩টি সংস্থায় এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় উপস্থিতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডিআইএর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ অভিযোগ রয়েছে—অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা নিয়মিত পরিদর্শনে যান না; আবার কেউ কেউ পরিদর্শনে গিয়েও ঘুষ গ্রহণ করে ‘অনিয়ম নেই’ মর্মে প্রতিবেদন দেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। এত বিশাল ব্যবস্থাকে তদারকি করতে গিয়ে জনবলঘাটতি বা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা বলা হলেও, সেগুলোর সমাধান না করে স্থবিরতা মেনে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই অধিদপ্তরের কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে বাড়ানোই ছিল প্রত্যাশিত; কিন্তু বাস্তবে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। সুশিক্ষিত, দক্ষ ও নৈতিক নাগরিক গড়ে না উঠলে রাষ্ট্রীয় সংহতি, উন্নয়ন ও জাতি গঠনের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অতএব, শিক্ষাব্যবস্থায় অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রশ্নে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। পরিদর্শন কার্যক্রমকে নিয়মিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, ডিআইএর জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ—এই মুহূর্তে সময়ের দাবি। অন্যথায় শিক্ষাব্যবস্থার এই স্থবিরতা কেবল শিক্ষা নয়, সমগ্র রাষ্ট্রকেই এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.