এইমাত্র পাওয়া

অনিয়ম ও ভুলে ভরা এমপিওভুক্তিতে বিব্রত সরকার

দীর্ঘ নয় বছর পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলো। অনেক আগে থেকেই এই এমপিওভুক্তির প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা হবে। কোনো তদবির চলবে না। এমনকি মন্ত্রী-এমপিদের তদবিরও শোনা হবে না। বিশেষ বিবেচনায় যে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও দেয়া হবে সেটিও হবে নীতিমালা অনুসরণ করেই। নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কিছুই করা হবে না। নীতিমালাটিও তৈরি করা হয়েছিল সময় নিয়ে বেশ আগেই।

দীর্ঘদিন যাচাই-বাছাই, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করা হলো। সেই তালিকাও দফায় দফায় যাচাই করে দেখা হলো, যাতে কোনো ভুল-ভ্রান্তি না থাকে। কিন্তু এতো কিছুর মধ্য দিয়ে এমপিওভুক্তির যে চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হলো তারমধ্যে এতো ভুল, এতো অনিয়ম থাকলো কী করে, এ প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কেউ দিতে পারছেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দোষারোপ করছে ব্যানবেইস-কে, অন্যদিকে ব্যানবেইসের কর্মকর্তারা দোষ চাপাচ্ছেন শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর।

গত ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৭৩০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। এমপিওভুক্তির তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, প্রায় অস্তিত্বহীন, সরকারিকৃত, আগের এমপিওভুক্ত, ভাড়া বাড়িতে ও ট্রাস্ট পরিচালিতসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অসঙ্গতির মধ্য দিয়ে এই এমপিও হয়েছে। স্বচ্ছভাবে এমপিওভুক্তির যে উদ্যোগ সেটির এমন ব্যর্থতার ঘটনায় সরকারের শীর্ষমহল বিব্রত। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনিও এ নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। তিনি ইতিমধ্যে এই মর্মে হঁশিয়ারি দিয়েছেন, যাদের দেয়া ভুল তথ্যে এমপিওভুক্তির ওপর এমন কালিমা পড়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী প্রত্যেক সংসদ সদস্যের কাছে এ বিষয়ে চিঠিও পাঠিয়েছেন।

জানা গেছে, অনিয়মের মধ্য দিয়ে বা ভুলক্রমে এমপিও’র তালিকায় ঢুকে পড়া বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভুল তথ্য দিয়ে এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পাওয়ার প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে, আর তথ্য সঠিক থাকলেই এমপিওভুক্তির আদেশ কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী তার চিঠিতে। প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ড ও ব্যানবেইস থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল, গত ১১ নভেম্বর লেখা চিঠিতে এ কথা উল্লেখ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।

নতুন এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম ফারুককে। ২০ কর্মদিবসের মধ্যে তারা সঠিকতা যাচাই করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবে। কমিটির সদস্য-সচিব করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের উপপরিচালক (মাধ্যমিক) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধিকেও রাখা হয়েছে কমিটিতে।

জানা গেছে, নতুন এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পাওয়া স্কুল-কলেজের তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর। নতুন এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গঠিত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে। ১৪ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়।

তবে এসব অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত অথবা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কার ভুলে এমনটি হলো সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। সব দোষ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ব্যানবেইস এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোতে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষিত আছে। এদের ভুল অথবা এদের দুর্নীতির কারণেই এমপিওভুক্তি নিয়ে এমন কেলেংকারি কা- ঘটে গেছে। অথচ এরা কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন না এখন। বরং পুরো বিষয়টি এখন ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে।

কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে, কার ভুলে এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার দিকে যাচ্ছেন না কর্মকর্তারা। তার বদলে মোটামুটি ভুল বা যুদ্ধাপরাধীদের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারিকরণ ও ইতোমধ্যে এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে একটা সারাংশ তৈরি করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা পুরো দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভুল তথ্য দিয়ে এমপিওভুক্তি নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৩ অক্টোবর এমপিওভুক্তির ঘোষণার পর দেখা যায়, প্রায় অর্ধশত অযোগ্য অথবা প্রায় অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার এমপিওভুক্ত হয়েছে। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত, শিক্ষার্থী নেই, পাস নেই, স্কুল ঘর নেই এমন প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছে। অস্তিত্বহীন টেকনিক্যাল কলেজ, এমনকি সরকারি হয়ে যাওয়া কলেজও এমপিও তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে। তারই প্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে আরও নতুন ছয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১২ নভেম্বর এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন এমপিওভুক্তির জন্য গত বছরের আগস্টে আবেদন করে ৯ হাজার ৬১৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ২৩ অক্টোবর এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। এরমধ্যে ২০৪টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিও দেয়া হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী চার শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেয়া হয়েছে। শর্তগুলো হলো- প্রতিষ্ঠানের বয়স বা স্বীকৃতির মেয়াদ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার। প্রতিটি পয়েন্টে ২৫ করে নম্বর থাকে। কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং স্বীকৃতির বয়স পূরণ করলে শতভাগ নম্বর দেয়া হয়। সর্বনিম্ন ৭০ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.