ফরিদপুরঃ কলেজ ক্যাম্পাসে এক মৌসুমে ৪ হাজারের বেশি ফলজ ও ওষুধি গাছ লাগিয়ে ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ স্লোগানের ধারণা যার হাত ধরে বাস্তবায়ন হয়েছে সেই অধ্যক্ষের বিদায় বেলায় শিক্ষার্থীদের অপার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন অধ্যক্ষ অসীম কুমার সাহা।
প্রিয় অধ্যক্ষকে বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছিল অশ্রুসিক্ত হাজারো শিক্ষার্থী। এমন একটি বিদায়ের মুহূর্ত সাম্প্রতিকালে দেখা যায়নি ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ক্যাম্পাসে। মঙ্গলবার (১২ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে কলেজটির শহর ক্যাম্পাসের বিশাল মাঠ সংলগ্ন শেখ কামাল মুক্ত মঞ্চে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অসীম সাহা যখন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তার বিদায় বক্তব্য রাখতে শুরু করেন তখন পিন পতন নিরবতার মধ্যে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সামনে বসা শিক্ষার্থী সকলের দৃষ্টি মুক্তমঞ্চের দিকে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তখন বিদায়ভাষণ দিচ্ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ অসীম কুমার সাহা। আগমীকাল বুধবার ১৩ মার্চ চাকরিজীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে অসীম সাহার। এর একদিন আগে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এ অনুষ্ঠানের।
বিদায়ী বক্তব্যে প্রিয়শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ প্রফেসর অসীম কুমার সাহা বলেন, তোমাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ-‘ভালো করে লেখাপড়া শিখে মানুষ হও। মানুষ না হলে এ শিক্ষা জীবন কোনো কাজে আসবে না। তোমাদের আত্মনির্ভরশীল, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল, দেশপ্রেমিক এবং সর্বপরি সৎ মানুষ মানুষ হতে হবে। মানুষ হও, দেশ-জাতি উপকৃত হবে। মানুষ তোমাদের মনে রাখবে।’
অধ্যক্ষের বক্তব্য যখন চলছিল তখন শিক্ষার্থীদের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। বিষন্নতায় আচ্ছন্ন তাদের মন। অনেক শিক্ষার্থীকে ঢুকরে কাঁদতে দেখা যায়। এ বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ওই কলেজের উপাধ্যক্ষ এস.এম. আব্দুল হালিম।
বিদায় সম্মাননা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক চন্দ্রমোহন হালদারের সভাপতিত্বে এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ফরিদপুর সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের সহধর্মিণী রমা সাহা, রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। ওই কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন।
অসীম কুমার সাহা ১৯৮২ সালে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৯৫ সালে তিনি প্রভাষক হিসেবে নিজ কলেজ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে যোগ দেন। ২০০১ সালে সহকারী অধ্যাপক, ২০০৮ সালে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০১৭ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এ কলেজে উপাধ্যক্ষ এবং সবশেষে ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন।
বিদায় অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষকে ঘিরে ধরেন। অনেক শিক্ষার্থী পা ছুয়ে সালাম করতে থাকেন, অনেকে অধ্যক্ষকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
এসময় অধ্যক্ষ তার প্রিয় শিক্ষার্থীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, সৃজনশীল-আলোকিত মানুষ হও। যে যেখানেই থাক রাজেন্দ্র কলেজের সম্মান তুলে ধর। তাহলেই তোমাদের এ কালেজের শিক্ষা গ্রহণ সার্থক হবে। এমন কোনো কাজ কোরো না যাতে রাজেন্দ্র কলেজের বদনাম হয়।
প্রসঙ্গত, ১৯১৮ সালে ফরিদপুরের পরিচিত মুখ, নিখিল ভারত কংগ্রেসের সভাপতি ও খ্যাতিমান আইনজীবী অম্বিকাচরণ মজুমদারের উদ্যোগ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৮ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে রাজেন্দ্র কলেজ। মানবিক বিভাগে মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয়েছিল কলেজটির পাঠদান কার্যক্রম। গত ১০৬ বছরে নানা পরিবর্তন-বিবর্তণে আসীম কুমার সাহার অধ্যক্ষ থাকাকালীন দুই বছরের প্রচেষ্টায় কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা সমাধানসহ কলেজে নানা নতুন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভর্তি, নিবন্ধন বা পরীক্ষার ফি প্রদান কিংবা ফরম পূরণ ডিজিটালি ই-পেমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে করা যায়। যেটা বাংলাদেশের সরকারি কলেজে রাজেন্দ্র কলেজে প্রথম শুরু হয়। এর ফলে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছোটাছুটি কমেছে, ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের লম্বা সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনা দূর হয়েছে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১২/০৩/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
