এইমাত্র পাওয়া

ব্লকপোস্টে পদন্নোতি, অবৈধ আয়ে কোটিপতি হাসপাতাল কর্মচারী দেলোয়ার

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকাঃ  অবৈধভাবে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মচারী মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির)  সকল আইন এবং নিয়ম কানুনের ঊর্ধ্বে। তিনি যেমন মানেন না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা তেমনই থোরাই কেয়ার করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশকেও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বদলীর আদেশ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত কোন মামলা তো হয়নি বরং এখনও একই মেডেকেল কলেজ হাসপাতালে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি।

জানা গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মচারী মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির) ১৯৯২ সালে ক্যাশিয়ার পদে যোগদান করেন। ব্লকপোস্টে যোগদান করেও তিনি নিয়মবহির্ভুতভাবে অবৈধ পন্থায় ২০১৪ সালে (১৯৮৫ সনের নিয়োগ বিধি লংঘন) প্রধান সহকারী হিসেবে পদন্নোতি বাগিয়ে নেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতি অর্থ বৎসরে বিভিন্ন খাত হতে বিভিন্ন প্যাডের মাধ্যমে ক্রয় মেরামত বাবদ ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ২০/৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ, হাসপাতালের কফি হাউজের বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্মসাৎ, প্রতি বৎসর সিসি ক্যামেরা ও ইন্টারকম মেরামত বাবদ বিল ভাউচারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া, প্রধান সহকারী হয়ে বিল ভাউচার তৈরী করা এবং হিসাব রক্ষক হয়ে বিল ভাউচার পাশ করা ও ক্যাশিয়ার হয়ে টাকা উত্তোলন করা অর্থাৎ তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করা এবং অবৈধভাবে কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করাসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর ইং তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (শৃঙ্খলা-২) ডাঃ হেলিশ রঙ্গন সরকার সরেজমিন তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্তে ১৯৮৫ সনের নিয়োগ বিধি লংঘন পূর্বক ক্যাশিয়ার পদ হতে প্রধান সহকারী পদে পদোন্নতি নেওয়া,  প্রতি অর্থ বৎসরে বিভিন্ন খাত হতে বিভিন্ন প্যাডের মাধ্যমে ক্রয় মেরামত বাবদ ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ২০/৩০ লক্ষ টাকা আত্নসাৎ করা,  হাসপাতালের কফি হাউজের বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্নসাৎ করা,  প্রতি বৎসর সিসি ক্যামেরা ও ইন্টারকম মেরামত বাবদ বিল ভাউচারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া, প্রধান সহকারী হয়ে বিল ভাউচার তৈরী করা এবং হিসাব রক্ষক হয়ে বিল ভাউচার পাশ করা ও ক্যাশিয়ার হয়ে টাকা উত্তোলন করা অর্থাৎ তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করা, এসি/কম্পিউটার/ইন্টারকম/ অন্যান্য মেরামত বাবদ প্রায় ২-২.৫ লক্ষ টাকা আত্নসাৎ করা, নিজ জেলা শরিয়তপুর ও কুমিল্লায় জায়গা জমি ক্রয় এবং কুমিল্লা শহরে ফ্ল্যাট ক্রয় করার অভিযোগসমূহ তদন্তে প্রমানিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তে মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির) কে বদলি এবং  ক্যাশিয়ার পদে পদায়নের আদেশ ও দুদকে মামলার জন্য পত্র দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ২০২০ সালের ০১ মার্চ ইং তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তরে কর্মচারী মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির) বদলির আদেশ জারি করেস্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ মোঃ বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত বদলির আদেশে তাকে তিন কর্ম দিবসের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয় অন্যথায় চার কর্মদিবস থেকে সরাসরি অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবে উল্লেখ করা হয়। তিন কর্মদিবস গিয়ে চার বছর পার হলেও সেই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। একই কর্মস্থলে তিনি দায়িত্ব পালন  করে যাচ্ছেন।

একই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে গত ২২ অক্টোবর ২০২০ ইং তারিখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ (প্রশাসন-১ অধিশাখা) থেকে দেলোয়ার হোসেন এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার নির্দেশ দিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জাকিয়া পারভিন স্বাক্ষরিত পত্রে উল্লেখ করা হয়, “মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির), প্রধান সহকারী, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের আলোকে সূত্রোক্ত ১ নং স্মারকে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যে বর্ণিত কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ বিভাগের সচিব মহোদয় বরাবর দাখিলকৃত অপর একটি অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় জানা যায় যে, তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২২/০৮/২০১৯ তারিখের ডিজিএইচএস/শৃঙ্খলা-৮৮/২০১৯/৬৩৫৩ সংখ্যক স্মারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি কর্তৃক সূত্রোক্ত ২ নং স্মারকে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির) এর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এমতাবস্থায়, মোঃ দেলোয়ার হোসেন (কবির), প্রধান সহকারী, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা-এর বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগসমূহের আলোকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয়/ফৌজদারি মামলা (যা অধিকতর যৌক্তিক) দায়ের করে তাকে উক্ত হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”  তবে নির্দেশনার তিন বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রশাসন।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তের একই সময়ে অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক সমন্বিত কুমিল্লা জেলা কার্যালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ সহ অবৈধ সম্পদ অর্জন সহ একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দুদকের চোখে কিছুই ধরা পরেনি। ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর ইং তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর এক বছর পর ২০২০ সালের ০১ নভেম্বর দুদক তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন সত্যতা পায়নি মর্মে তাকে অব্যাহতি প্রদান করে। ২০২০ সালের ০১ নভেম্বর দুদকের তৎকালীন সিনিয়র সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দেলোয়ার হোসেন এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতের টাকা আত্মসাৎ, নিজ গ্রামে জমি ক্রয়, কুমিল্লায় জমি ক্রয়, গাজীপুরে জমি ক্রয়সহ অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় কমিশন কর্তৃক তা পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক তদন্তে উল্লেখিত দেলোয়ার হোসেন এর সম্পত্তির বিবরণী। ছবি সূত্রঃ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে প্রতিবেদনে দেলোয়ার হোসেন এর কোথায় কি সম্পদ অর্জন করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দাগ খতিয়ান নম্বর সহ উঠে আসলেও দুদক কিছু না পাওয়ায় দুদকের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠে হাসপাতাল কর্মচারীদের মধ্যে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেন (কবির) এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডাঃ মোঃ শাহজাহান বিষয়টি নিয়ে  দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডাঃ নিশাত সুলতানার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

তবে এই বিষয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহকারী পরিচালক ডাঃ নিশাত সুলতানার মুঠোফোনে কল করে এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ (প্রশাসন-১ অধিশাখা) যুগ্ম সচিব তৎকালীন উপসচিব) জাকিয়া সুলতানা (যিনি বিভাগীয় মামলা করতে চিঠি ইস্যু করেছিলেন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি গত নয় মাস যাবত এই শাখায় নেই। বর্তমানে যারা আছেন তারা বলতে পারবেন। এই শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন তিনি সর্বশেষ এই বিষয়ে বলতে পারবেন।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৭/০৩/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.