এইমাত্র পাওয়া
ফাইল ছবি

নতুন শিক্ষাপদ্ধতি গবেষণালব্ধ টেকসই পদ্ধতি, এরপরও কেন এত বিতর্ক!

রহিম আব্দুর রহিমঃ একটি জাতির স্বপ্ন নিহিত ঐ জাতির পাঠক্রমে—যেখানে লুক্কায়িত থাকে শিক্ষার্থীকে শিখতে সাহায্য করা এবং তাকে পরিপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সব কলাকৌশল। একজন শিক্ষার্থীর স্কুল কোন দেশ বা জেলায় অবস্থিত, তা বিবেচ্য নয়, যেখানেই শুরু হোক, একটি দৃঢ় এবং টেকসই ফলাফলের মধ্য দিয়েই অবস্থান তৈরি হবে।

বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি এমন একটা পদ্ধতি, যে পদ্ধতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঘিরে যাপিত জীবনব্যবস্থায় গেড়ে বসা সব ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন ঘটবে। এই শিক্ষাপদ্ধতি সব ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে একজন ভাবী প্রজন্মকে মানবিক গুণাবলিসমৃদ্ধ স্বচ্ছ মানুষ হিসেবে রূপান্তরিত করবে, যা কিনা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্রের মূলযন্ত্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে।

বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিতে ‘শেখা’ ও ‘শেখানো’ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম। এই শিক্ষায় একটি জাতির সংস্কৃতি এবং ঐ জাতির পরিচয় তৈরির দিকনির্দেশনা যেমন রয়েছে, তেমনি তার প্রতিফলন ঘটানোর বহুবিধ দরজা উন্মুক্ত রয়েছে। অপূর্ব শিক্ষা পদ্ধতি! প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে পরস্পরের সহযোগিতা ছিল অনুপস্থিত। বর্তমান পদ্ধতিতে সহযোগিতার সব দরজা খোলা।

শিক্ষকরা একে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এই শিক্ষাপদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকালীন তুলনামূলকভাবে আর্থিক সাশ্রয় ঘটবে। বর্তমান শিক্ষা পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য স্থিরকরণেরও পরিপূরক। জরাজীর্ণ একটি পুরাতন পদ্ধতি থেকে শিক্ষাকে নতুন পদ্ধতিতে আনা হয়েছে। আগে শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বুঝে বা না-বুঝেই সংশ্লিষ্ট বিষয় মুখস্থ করে রাখত, যা একজন শিক্ষার্থীর জন্য কল্যাণকর নয়। বর্তমান পদ্ধতিতে হাতেকলমে শেখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে; ফলে একজন শিক্ষার্থী বাস্তবিক কাজের মাধ্যমে শেখার এবং নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারছে। শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে, আলোচনা করে, খেলার ছলে, অভিনয়ের আদলে, সশরীরে কর্মকৌশলে যোগদান করে টেকসই শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমান শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থী শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনেই শুধু পারদর্শী হবে না, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী বিষয়টির সম্পাদনা করার যোগ্যতা অর্জন করবে। বর্তমান শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, আগে পাঠদানে ক্লাসে শিক্ষকের ভূমিকা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ। শিক্ষক বলে যেতেন, বিশ্লেষণ করতেন; শিক্ষার্থীরা হাঁ করে শুনত। বর্তমানে শিক্ষক ক্লাসে শুধু দিকনির্দেশকের ভূমিকায় থাকবেন, শিক্ষার্থীরাই সবকিছু করবে; অর্থাত্ ‘শিক্ষককেন্দ্রিক’ পদ্ধতি পরিবর্তন হয়ে ‘শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক’ পদ্ধতি চালু হয়েছে। কিন্তু পূর্ববর্তী পাঠ্যক্রমে ছিল—শিক্ষক জ্ঞান প্রদানে, শেখার প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতেন। বিপরীতভাবে, নতুন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রে থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে সমালোচনামূলক চিন্তা এবং স্বনির্দেশিত শিক্ষায় উত্সাহিত হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং চলমান ইন্টারেকটিভ শ্রেণিকক্ষ পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। পুরাতন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীদেরকে যেখানে যথেষ্ট হতাশায় কাটাতে হতো, সেখানে নতুন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীরা আনন্দঘন পরিবেশে শিখবে, পড়বে এবং নিবেদন করবে।

নতুন শিক্ষাক্রমে রয়েছে—উদ্ভাবনী শিক্ষণপদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ইন্টারেকটিভ কার্যক্রমের সমাহার, যার মাধ্যমে ইতিবাচক শিখন পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব। এই পদ্ধতি শুধু জ্ঞান ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় না, বরং জ্ঞান অর্জনে প্রকৃত আগ্রহও জাগিয়ে তুলবে।

পুরোনো পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা হয়তো ব্যাবহারিক দক্ষতাগুলোর দিকে যথাযথ মনোযোগ দেয়নি। নতুন শিক্ষাক্রম নিশ্চিত করে যে, শিক্ষার্থীরা প্রকৃত কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করবে। এতে প্রকল্প, সিমুলেশন, সমস্যা সমাধান, সময় ব্যবস্থাপনা, জনসমক্ষে কথা বলা, নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, টিমে কাজ করা, গবেষণায় দক্ষতা, সম্পাদনা ও প্রুফ রিডিং বা অন্যান্য কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে। যে সমস্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যত্-পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

নতুন শিক্ষণপদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের সঙ্গে সাবলীলভাবে কথা বলা, একসঙ্গে কাজ করা এবং চিন্তাভাবনায় সমন্বয় করার মতো সফট স্কিলের দিকে অগ্রসর হবে। যে দক্ষতা বর্তমান বিশ্বের সব ধরনের কর্মস্থলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই, কেউ বলছেন—‘ছেলেমেয়েরা বাড়িতে পড়াশোনা করছে না’, কেউ বলছেন, ‘পরীক্ষা না থাকায় লেখাপড়া লাটে উঠছে’, আবার কেউ বলছেন, ‘পড়াশোনা রেখে কীসব রান্নাবান্না শেখাচ্ছেন!’ যারা বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন, তারা নতুন পদ্ধতির ভেতর-বাহির খতিয়ে দেখেছেন কি না, সন্দেহ আছে। আমি অধ্যাপনা পেশায় জড়িত। নতুন শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে আমিও কম মন্তব্য করিনি। মোট সাতটি স্কুলের হাতেগোনা একুশ জন সুদক্ষ শিক্ষকের সঙ্গে নতুন পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছি, তাদের কাছে বুঝতে চেয়েছি, পদ্ধতিটির ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিকগুলো। সবাই বলেছেন, এটা আমাদের মতো দেশের জন্য নয়। কেন, কী কারণে তা তারা খোলাসা করতে পারেননি। সম্ভবত মাস্টার ট্রেইনারদের দুর্বলতার কারণে এমনটি হতে পারে। সর্বোপরি দেশের প্রখ্যাত একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের এক নবীন শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছি, আলোচনা-সমালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ। জানতে চেয়েছিলাম, শিক্ষা অর্জনের তিন সূচক ‘বলতে পারবে’, ‘পড়তে পারবে’, ‘লিখতে পারবে?’—এগুলো কি নতুন শিক্ষাপদ্ধতিতে আছে কি না? সে স্পষ্ট করেছে, আগের তুলনায় এখন এই তিনটি সূচকের প্রসার তো হয়েছেই, সঙ্গে আরো একটি সূচক যুক্ত হয়েছে, তা হলো ‘করতে পারবে’। অর্থাত্ নতুন শিক্ষাপদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী, ‘বলতে পারবে, পড়তে পারবে, লিখতে পারবে—সর্বোপরি করতে পারবে।’ তার কাছে আরো জানতে চেয়েছিলাম ‘পরীক্ষা নেই’, ‘শিক্ষার্থীরা বাসাবাড়িতে’, ‘পড়ার টেবিলেও নেই কেন’ তিনি বলেছেন, ‘পরীক্ষা নেই মানে, এখন তো ধারাবাহিক মূল্যায়ন হচ্ছে। আগের চেয়ে এখন পরীক্ষা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্লাসেই পড়া শেখানো হচ্ছে। এখন আর মাথা ঝুঁকে, প্রাইভেট পড়ে কিংবা মুখস্থ করার মতো শিক্ষার দরকার নেই।’ নতুন শিক্ষাপদ্ধতি গবেষণালব্ধ টেকসই পদ্ধতি। এর পরও এ নিয়ে কেন বিতর্ক! তা গবেষণার দাবিদার।

লেখক: শিক্ষক

“মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৭/০১/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.