সুনামগঞ্জঃ নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই বলেছেন- যোগ্যতার ভিত্তিতেই চলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কার্যক্রম। অথচ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিয়েছেন নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে। সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের সহকারী একান্ত সচিব হাসনাত হোসেনের ছোটভাইকে বানিয়েছেন কোষাধ্যক্ষ। সবশেষে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের লোক দেখানো পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন গাজীপুরে, নিজের আস্তানায়। যদিও সুনামগঞ্জবাসীর প্রবল প্রতিবাদের মুখে সেই নিয়োগ পরীক্ষা মৌখিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) ভিসি ড. মো. আবু নঈম শেখের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগসহ এরকম নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। প্রসঙ্গত, গত বছর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এই অধ্যাপকের সুনামগঞ্জে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে না থেকে তিনি রাজধানীর বসুন্ধরা এবং গাজীপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম চালাচ্ছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মো. আবু নঈম শেখ বলেন, গাজীপুরে যে পরীক্ষা নেয়ার কথা ছিল সেটি স্থগিত করা হয়েছে। পরীক্ষা সুনামগঞ্জেই হবে। তবে কবে হবে তার কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। ভিসি হিসেবে তার নিয়োগপত্রে লেখা ছিল, সুনামগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকতে হবে। কিন্তু তিনি কেন থাকেন না, সে প্রশ্নের উত্তর দেননি। অন্যান্য
অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার দুর্ভাগ্য আমাকে এসব প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ অনুমোদন হওয়ার পর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান গাজীপুর ডুয়েটের গণিত বিভাগের প্রধান ড. মো. আবু নঈম শেখ। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই ভিসি অত্যন্ত সুকৌশলে শুরু করেন নিয়োগ বাণিজ্য। নিয়ম অনুযায়ী, ভিসি সুবিপ্রবির ক্যাম্পাসে থাকার কথা থাকলেও তিনি সুদুর গাজীপুরে বসেই দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে কয়টি পদে লোক নিয়োগ করা হয়েছে সেখানেও করেছেন স্বজনপ্রীতি। সুনামগঞ্জের মানুষকে বঞ্চিত করে নিয়োগ দিয়েছেন সাবেক কর্মস্থল গাজীপুরের লোকজনকে।
এখানেই থেমে থাকেননি ভিসি আবু নঈম শেখ। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই গোপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের রাজনৈতিক সচিব শান্তিগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসনাত হোসেনের ছোটভাই মনোয়ার হোসেনকে। এসব বিষয় নিয়ে সুনামগঞ্জবাসীর অন্তর্দহনের শেষ ছিল না। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে ভিসির এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিরবে সহ্য করেছেন সুনামগঞ্জবাসী। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে সহায়ক পদে নিযোগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র পাঠানো হয়।
প্রবেশপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আপনার আবেদনের প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে- আগামী ১৯/০১/২০২৪ ইং তারিখ রোজ শুক্রবার সকাল ১০.০০ ঘটিকায় অফিস সহায়ক পদের লিখিত পরীক্ষা ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর-১৭০৭ এ অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখিত তারিখে প্রবেশপত্রসহ আপনাকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য বলা যাচ্ছে।’
শুক্রবার রাতে এমন একটি প্রবেশপত্র ফেসবুকে আপলোড হলে জেলাজুড়ে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষা ডুয়েটে হওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন সুনামগঞ্জবাসী। পরীক্ষার খাতা দেখা এবং ভেন্যু সংকটসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে সুনামগঞ্জে পরীক্ষা না নিয়ে গাজীপুরে পরীক্ষার আয়োজনকে ভালোভাবে দেখছেন না শহরের বিশিষ্টজনরাও। অনেকেই এর কড়া সমোলোচনা করে আন্দোলনের কথাও বলেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে এক পর্যায়ে শুক্রবার রাতেই সিদ্ধান্ত পাল্টান ভিসি।
এর আগে আইনজীবী এ আর জুয়েল তার ফেসবুকে পোস্টে লেখেন- ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অফিস সহায়ক পদে পরীক্ষা গাজীপুর গিয়ে দিতে হবে কেন? সুনামগঞ্জ কি এটা নেয়ার সুযোগ নেই। নাকি এতে অন্য কোনো উদ্দেশ্য। তার মানে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামটাই সুনামগঞ্জে আর বাকি সবকিছুর চাবি আপনাদের হাতেই।’ রিংকু চৌধুরী নামে আরেকজন লেখেন- ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন পদে নিয়োগ পরীক্ষা গাজীপুর কেন? সুনামগঞ্জে কি পরীক্ষা নেয়ার জায়গা নাই? না, অন্য কোনো কারণ? সুনামগঞ্জের যে কোনো কলেজে পরীক্ষা নিলে অসুবিধা কোথায়? নাকি অন্য জেলার মানুষের জীবন জীবিকার সুযোগ দিতে এবং সুনামগঞ্জসহ সিলেটের পরীক্ষার্থীদের বঞ্চিত করার কৌশল? দয়া করে ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে সকল নিয়োগ পরীক্ষা সুনামগঞ্জে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুনামগঞ্জের লোকজন ছাড়া ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে অন্য জেলার লোক নিয়োগ দেয়া যাবে না। হাওরপাড়ের মানুষকে সুযোগ দিতেই হবে।’
সুনামগঞ্জের অনেকেই মনে করছেন, কৌশলে সুনামগঞ্জ থেকে ভেন্যু সরিয়ে নিয়ে লোক চক্ষুর আড়ালে নীরব নিয়োগ বাণিজ্য করা হবে। সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সহকারী সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে সুনামগঞ্জবাসীকে বঞ্চিত করার উদ্দেশে সুনামগঞ্জের পরীক্ষা গাজীপুরে নেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করলে সুনামগঞ্জবাসী আন্দোলনে নামবে। আশা করি কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সুনামগঞ্জেই পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করবেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগ পরীক্ষা গাজীপুরে নিলে পরীক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হবেন। এ পরীক্ষা সুনামগঞ্জেই নেয়া সম্ভব।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, লোকবল সংকট দেখিয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা গাজীপুরে নেয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এটা যৌক্তিক ব্যাখ্যাও নয়। আমি এটা নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলব।
এরপর রাত সাড়ে ৯টায় ভিসি ড. আবু নঈম শেখ জেলার একাধিক গণমাধ্যকর্মীকে কল করে জানান, ডুয়েটে অনুষ্ঠেয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আমরা পরীক্ষা কেন্দ্র স্থানান্তর করবো। সুনামগঞ্জেই হবে পরীক্ষা।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
