ড. এম তারিক আহসানঃ নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা তুঙ্গে। অনেকে বলছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধংসের দ্বারপ্রান্তে; লেখাপড়া উঠে গেল; কোনো পরীক্ষা নেই; শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পাননি; স্কুলগুলোতে পড়ালেখার নামে সার্কাস চলছে ইত্যাদি। বাস্তবে শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন শুধু নতুন পাঠ্যবই ছাপানোর বিষয় নয়। এটি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক রূপান্তর প্রক্রিয়া। এই রূপান্তর যেহেতু বৈশ্বিক রূপান্তরেরই অংশ; ফলে অনেকের কাছে খটকাও লাগছে। এমন ধারণাও তৈরি হচ্ছে, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে যথেষ্ট পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি নেই। আসলেই কি এবারের শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে?
জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিবর্তন হয় গবেষণানির্ভর প্রমাণের ভিত্তিতে। এবারের শিক্ষাক্রম প্রণয়নের আগে ২০১৭-১৯ সালে এনসিটিবি ৬টি গবেষণা পরিচালনা করে, যার ভিত্তিতে এই রূপরেখা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এসব গবেষণায় সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাধারায় আগের শিক্ষাক্রমের সাফল্য এবং চ্যালেঞ্জ বের করার পাশাপাশি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট, শিক্ষার্থীদের চাহিদা, পুরাতন শিক্ষাক্রমের কার্যকারিতা যাচাই, ১০২টি দেশের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে অভিযোজনের উপায় ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন সভা, কর্মশালার মাধ্যমে ১৫০-এর বেশি শিক্ষাবিদ বা বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত; সাধারণ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাধারার মাঠ পর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ ৮ শতাধিক অংশীজনের সুপারিশ অনুযায়ী ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১’ খসড়া প্রণয়ন করা হয়। দেশের পাঁচটি স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এনসিটিবির ওয়েবসাইটে খসড়ার ওপর মতামত সংগ্রহের জন্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং তাদের মতামত পর্যালোচনার ভিত্তিতে খসড়া পরিমার্জন করা হয়। খসড়া শিক্ষাক্রম রূপরেখাটি জাতীয় সংসদের শিক্ষাবিষয়ক কমিটির সম্মানিত সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করে তাদের মতামতও গ্রহণ করা হয়। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনার আলোকে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১’ চূড়ান্ত ও অনুমোদন করা হয়।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষাবিষয়ক দুই মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবির দুই উইং একসঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত একই লক্ষ্য, উদ্দেশ্য অর্জনে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাক্রম রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। এর ফলে শিক্ষার বিভিন্ন স্তর ও ধারার (মূলধারা, ইংরেজি ভার্সন, মাদ্রাসা ও কারিগরি) মাঝে সমন্বয় সম্ভব হবে। এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উত্তরণ বাধাহীন হবে; ঝরে পড়া কমবে; বিভিন্ন ধারার মাঝে সমন্বয় এবং একই লক্ষ্য নিয়ে জাতি গঠন হবে। ব্যাপক পরিসরে এত প্রক্রিয়া কিন্তু এর আগে কখনও শিক্ষাক্রম প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।
জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাক্রম তৈরির দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কাজেই জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১-এর আলোকে দুই শতাধিক বিষয় বিশেষজ্ঞ ও শিখন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে বিস্তারিত শিক্ষাক্রম প্রস্তুত করা হয়, যা জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২২ হিসেবে পরিচিত। রূপান্তরের ধারণা শিখন উপকরণে সঠিকভাবে বিস্তরণের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনার প্রতিটি বিষয়ের লেখক দল তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়েছে যেন শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারী দলের একজন সদস্য প্রতিটি দলে উপস্থিত থাকেন। এ ছাড়া বিষয় বিশেষজ্ঞ, শিখন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, স্কুলশিক্ষক, শিক্ষক-প্রশিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রতিটি বিষয়ের লেখক দল তৈরি হয়, যাতে বই লেখার সময় প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব পটভূমি থেকে মতামত দিয়ে বইটি সবার উপযোগী করে লেখেন। পাঠ্যপুস্তক রচনার পর তার চিত্র আঁকা ও ডিজাইন সম্পন্ন করার জন্য একটি শিল্প-নির্দেশনা দল কাজ করে। এর পর পঞ্চাশের বেশি প্রথিতযশা শিক্ষাবিদের মতামত, জেন্ডার ও ইনক্লুশন বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনার ভিত্তিতে এবং ভাষাগত সম্পাদনার পরেই এসব পাঠ্যপুস্তক চূড়ান্ত করা হয়।
এবারের শিক্ষাক্রমের আলোকে রূপান্তরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম প্রণয়নের ইতিহাসে এই প্রথম দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে ৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালে এক বছরব্যাপী পাইলটিংয়ের মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনা করে এর পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিমার্জনের মাধ্যমে তা দেশব্যাপী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই পাইলটিং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সারাদেশে ২০২৩ সালে প্রথম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে পরীক্ষামূলক নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়।
বলা হয়ে থাকে, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পাননি। বাস্তবে এই প্রথম নতুন শিক্ষাক্রম বিদ্যালয়ে বাস্তবায়নের আগেই শিক্ষক সহায়িকা এবং সব শিক্ষকের অনলাইন প্রশিক্ষণ, ফেস টু ফেস প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক লিখিত ও ভিডিও নির্দেশনা প্রদান এবং ডিজিটাল মেন্টরিং গ্রুপ তৈরি করে বছরব্যাপী পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি সহজ ও সাবলীল করার জন্য মূল্যায়ন অ্যাপ ‘নৈপুণ্য’ চালু করা হয়েছে। ‘নৈপুণ্য’তে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন ও অন্যান্য কার্যক্রম চলমান। প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সারাবছরের মূল্যায়ন রেকর্ড সংরক্ষিত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনদ তৈরি হবে এই অ্যাপের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ শিখন উন্নয়নের পোর্টফোলিও তৈরির পাশাপাশি শিক্ষক,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই সব চ্যালেঞ্জ সমাধান করে তার পর নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেনি। আবার চ্যালেঞ্জের ভয়ে পিছিয়ে থাকলে সারাজীবন সেই পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থার বেড়াজালেই আবদ্ধ থাকতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের রূপান্তর নিয়ে যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ এবং সমালোচনা হচ্ছে সারাদেশে; এটি আসলে রূপান্তর ঘটার বড় নির্দেশক। মানুষের এই বড় রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে একটু সময় লাগবে– তা বিবেচনায় নিয়েই কিন্তু শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন ১০ বছর ধরে ধীরে ধীরেপরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে।
লেখক: অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটি, এনসিটিবি
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১১/০১/২০২৪
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
