মো. এরশাদ হালিমঃ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে ১৯৯২ সালে এসএসসিতে প্রথমবারের মতো চালু হয় ৫০ শতাংশ অবজেকটিভ কোর্স পদ্ধতি। একই সঙ্গে চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ের অবজেকটিভ অংশের জন্য ৫০০ প্রশ্নের ‘প্রশ্ন ব্যাংক’ নির্ধারণ করা হয়। তবে ফল প্রকাশের পর সবার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় স্টারপ্রাপ্তদের (৭৫% ও তদূর্ধ্ব নম্বর) গণজোয়ার দেখে। সম্ভবত এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ১৯৯৪ কিংবা ১৯৯৫ সালে এইচএসসিতে শুধু সাবজেক্টিভ কোর্স পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়। কিন্তু তখন দেখা গেল গণফেলের মহাপ্লাবন।
সম্প্রতি আবারও ওই বিপরীতধর্মী ফল দেখা গেল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায়। ২০২১ সালে করোনা মহামারিজনিত কারণে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হয় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস পদ্ধতিতে। উভয় পরীক্ষাতেই দেখা গেল জিপিএ ৫-এর ছড়াছড়ি। কিন্তু ২০২১ সালের এসএসসি উত্তীর্ণরা যখন পূর্ণ সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা দিল, সেখানে ঘটল বিপর্যয়। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের এইচএসসি উত্তীর্ণরা যখন উচ্চতর শিক্ষার জন্য ঢাকাসহ নামকরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, সিংহভাগই সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছর আগের সেই দৃশ্যের অবতারণা ঘটল।
শুধু এবারই নয়; বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পাবলিক ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ জন্য দায়ী প্রধানত এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলের নামে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক প্রকার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যেখানে যে কোনো মূল্যে জিপিএ ৫ অর্জনই শেষ কথা। গাইড বই ও কোচিং সেন্টারের সহায়তায় কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন গিলে খেয়ে পরীক্ষার খাতায় যে যত হুবহু উগরে দিতে পারে, তার ভাগ্যেই ছিঁড়ে কথিত সাফল্যের শিকে। এর ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষার ভিত যথেষ্ট পোক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না। এ দুর্বল ভিত নিয়ে সে যখন প্রকৃত পরীক্ষার মুখোমুখি হয়, তখনই নেমে আসে বিপর্যয়।
আসলে জিপিএ ৫ সবকিছু নয়। আমাদের অভিভাবকদের উচিত ছেলেমেয়ের সামনে শুধু জিপিএ ৫-এর ভাঙা রেকর্ড না বাজিয়ে তাদের ভিত গড়ার দিকে বেশি নজর দেওয়া। আমি এখানে ভালো ফল কিংবা জিপিএ ৫ কোনোটাকেই খাটো করে দেখছি না। ভালো ফল সত্যিকার অর্থেই মেধার বহিঃপ্রকাশ, যদি তা হয় পুরোপুরি শিক্ষার্থীর স্বকীয়তার ভিত্তিতে অর্জিত। তা না হলে অনেক সময় হতে পারে আত্মঘাতী। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের কোমলমতি শিশুদের ওপর রীতিমতো জুলুম করা হয় এবং আমাদের দ্বারা আরোপিত এই মানসিক চাপের কারণে তাদের মেধার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। কোমলমতি শিশুরা এভাবে হারিয়ে ফেলে তাদের সঞ্জীবনী শক্তি ও পড়াশোনার প্রতি সহজাত প্রবণতা। একসময় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে লেখাপড়া বিশেষ করে গতানুগতিক মুখস্থনির্ভর পড়ার প্রতি। অকালে ঝরে পড়ে বহু প্রতিভা। রাষ্ট্র ও জাতি হারায় প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ এবং সুনাগরিক গঠনের যথাযথ হাতিয়ার। বিশ্ব-প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়ে দেশ।
প্রতিভা লালনের পরিবর্তে প্রতিভা বিনাশের এ আয়োজন থেকে আমাদের এখনই সরে আসা উচিত। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অনেক মাশুল গুনতে হবে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় জীবনেও। বিষয়টিকে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর সমাধানে এখন থেকেই টেকসই ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক সবাইকে সচেতন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার কিংবা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, উর্বর জমিতে ভালো ফসল পেতে হলে কৃষককে সঠিক পদ্ধতি
অনুসরণ করেই কৃষিকাজ করতে হবে। অতিরিক্ত সার প্রয়োগে ভালো ফসল দূরের কথা, বরং ভূমি হারাতে পারে ফসল উৎপাদনের স্বাভাবিক ক্ষমতা।
এ কথাও মনে রাখা দরকার, জিপিএ ৫ সবার জন্য নয়। এটা কাউকে নিজের চেষ্টা ও যোগ্যতায় পারিপার্শ্বিক সর্বাত্মক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ নিজেকে এ জন্য যোগ্য করে নিতে হয়। যদি কেউ তা করতে না পারে, তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিকল্প আয়োজন থাকতে হবে। প্রয়োজনে তার জন্য কর্মমুখী বিকল্প কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিতে হবে। উপরন্তু উচ্চতর শিক্ষাও সবার জন্য অত্যাবশ্যক নয়। যদিও অক্ষরজ্ঞানসহ ন্যূনতম একটা শিক্ষা তো বটেই; একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। আমাদের সংবিধানও এ কথা বলে। আমি বলতে চাচ্ছি, কোনো অক্ষম ব্যক্তিকে জোর করে ওপরে তুলতে চাইলেও সে খুব বেশি ওপরে উঠতে পারে না। উঠলেও সেই পর্যায়ে টিকতে পারে না। শ্রাবণের মৌসুমে প্লাবনের মতো বর্ষণের কারণে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত বহু নদীতেই পানি উপচে পড়ে। কিন্তু শুধু খরস্রোতা নদীই সদা বহমান নিজস্ব গতিতে।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৩/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
