চবিতে শিক্ষক নিয়োগে মুখোমুখি উপাচার্য-শিক্ষক সমিতি

চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দুই বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ–বোর্ড বাতিলের দাবিতে মুখোমুখি অবস্থানে উপাচার্য ও শিক্ষক সমিতির নেতারা। গতকাল রোববার দিনভর এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। এদিন দুপুরে শিক্ষক সমিতির নেতারা নিয়োগ বাতিলের দাবিতে চিঠি দিতে যান উপাচার্য কার্যালয়ে। এ সময় দু’পক্ষ চরম বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। রোববার ২টা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা উপাচার্য দপ্তরে অবস্থান নেন প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক।

পরে সন্ধ্যায় শিক্ষক সমিতির কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে উপাচার্য ও উপ–উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে কর্মসূচি ঘোষণা করে চবি শিক্ষক সমিতি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে পদত্যাগের একদফা দাবিতে আজ সোমবার সকালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দুই ঘণ্টা অবস্থান নিবেন শিক্ষকরা।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে বাংলোতে গিয়ে ভাইভা নেওয়াটা নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগেও আমরা বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি জানিয়েছিলাম। তবে প্রশাসন সে দিকে কর্ণপাত করেনি। অন্যায়কে বাস্তবায়ন করার জন্য আজ যে গর্হিত কাজ উপাচার্য করেছেন তা আইনের পরিপন্থী। এই ঘটনায় উপ–উপাচার্যেরও দায় আছে বলে মনে করি।

সরেজমিন দেখা যায়, রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপাচার্যকে আইন ও বাংলা বিভাগের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে চিঠি দিতে উপাচার্য কার্যালয়ে যান শিক্ষক সমিতির নেতাসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষক। উপাচার্যের উপস্থিতিতে শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী এ চিঠি পাঠ করার এক পর্যায়ে উপাচার্য উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উপাচার্যপন্থী ও শিক্ষক সমিতির শিক্ষকরা বাকবিতণ্ডায় জড়ান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপাচার্য দপ্তরে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এসময় প্রশাসনপন্থী শিক্ষকরা কয়েক দফায় উপাচার্য দপ্তর থেকে সাংবাদিকদের বাইরে বের করার চেষ্টা করেন। প্রশাসনপন্থী শিক্ষকরা প্রশাসন মনোনীত বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আবদুল হক বলেন, আমরা উপাচার্যকে বোঝানোর জন্য গেলে তিনি কথা পর্যন্ত বলেননি। একপর্যায়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতির সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

আইন বিভাগের প্রফেসর ড. এবিএম আবু নোমান বলেন, সিলেকশন বোর্ডের মেম্বার ও প্রার্থীকে একই গাড়িতে করে উপাচার্য দপ্তর ত্যাগ করতে দেখা গেছে যা আইন বহির্ভূত। প্রার্থীর সাথে বোর্ড মেম্বারদের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যদি থাকে, তা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

উপাচার্য বাংলোতে নিয়োগ–বোর্ড বসানোর বিষয়ে জানার জন্য উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারকে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। বোর্ডের অন্য সদস্যদের মধ্যে আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক কল কেটে দেন এবং একই বিভাগের প্রফেসর নির্মল কুমার সাহাকে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনিও কথা না বলে কল কেটে দেন।

বোর্ডের আরেক সদস্য আইন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. রকিবা নবী বলেন, “‘অবৈধ’ বাধার মুখে উপাচার্যের কার্যালয়ের পরিবর্তে ভিসির বাংলোতে উপস্থিত মোট ৮ জন প্রার্থীর ভাইভা নিয়েছি। এই নিয়োগে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। পরিকল্পনা কমিটি পরপর তিনবার শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ না করলে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপাচার্য নির্বাহী ক্ষমতায় নিয়োগ দিতে পারেন।”

তিনি আরও বলেন, আইন বিভাগের ক্লাসলোড রয়েছে। মাস্টার্সের সাতটা কোর্স আমরা শিক্ষকের অভাবে চালু করতে পারছি না। এছাড়া আউটকাম বেজড এডুকেশনে ক্লাসলোড বেশিই হবে। আরও কিছু কোর্স আমাদের চালু করতে হবে। তারা তর্কের খাতিরে তর্ক করছেন। তারা ভিসি অফিস ঘেরাও করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন যা নজিরবিহীন ঘটনা।

প্রার্থী ও বোর্ড সদস্যদের একই গাড়িতে দপ্তর ত্যাগ করার বিষয়ে তিনি বলেন, উপাচার্য তার গাড়িতে করে গেছেন। আমরা আলাদাভাবে গেছি। আমাদের সাথে কোনো প্রার্থী ছিলেন না।

এদিকে, সোমবার বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠিতব্য নিয়োগ–বোর্ড থেকে চার সদস্যের মধ্যে দুইজন অংশ নিবেন না বলে উপাচার্য বরাবর এক চিঠিতে জানান। এ দুইজন হলেন, বাংলা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. তাসলিমা বেগম ও বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রফেসর ড. মহিবুল আজিজ। পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী কোনো বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হলে প্রথমে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির সভায় তা অনুমোদন করতে হয়। সভায় অনুমোদিত হলে তা রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠাবেন বিভাগের সভাপতি। পরবর্তীকালে রেজিস্ট্রার বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উপাচার্যের সম্মতি নিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবেন। রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা আবেদনপত্র সংগ্রহ করে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটিতে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য প্রেরণ করবে। এসব নিয়মের কোনো কিছুই মানা হয়নি বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্ল্যানিং কমিটি তিন মাসের মধ্যে সুপারিশ না করলে উপাচার্য নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিতে পারবেন। ১৯৯৪ সালের সিন্ডিকেট উপাচার্যকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। এছাড়া ইউজিসির একটা নির্দেশনাও আছে অবসরজনিত শূন্য পদগুলো সংশ্লিষ্ট অর্থ বছরেই পূরণ করতে হবে। সর্বোপরি আইন মেনেই এই নিয়োগগুলো হচ্ছে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৮/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.