ড. কেএম আতিকুর রহমান।।
জনৈক সিইও বলেছেন, বাংলাদেশে আমি কোন বেকার মানুষ দেখি না; যা দেখি তাহলো অযোগ্য ও অদক্ষ লোক। দুই কোটি শিক্ষিত অদক্ষ (বেকার) লোকের ভারে দেশের লাগসই পরিবর্তন যেমন হচ্ছে না, তেমনি অস্থিরতা প্রতিটি ক্ষেত্রকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে ফেলেছে। প্রথমেই আসবো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা নিয়ে। প্রতিবছর স্নাতক হওয়াদের ৮০%-ই সনাতন বিষয়গুলো মুখস্থ করে কাজের বাজারে প্রবেশ করছে। সনাতন বিষয় বলতে কাজের বাজারে যার তেমন কোন স্থান নেই।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তিমূলক কোর্স বা বিষয় পড়ানো শুরু হয়েছে। কিন্তু সেখানেও গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতি অধিকাংশ জায়গাটা দখল করে রেখেছে। যেমন: গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষা, ল্যাব ওয়ার্কের মাধ্যমে জানা, কাজের মাধ্যমে শেখা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার কথা মাথায় রেখে কারিকুলাম সাজানো। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক সমস্যার মাঝেও কিছু শুরু করেছে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাটা অনেক বেশি শ্রমসাধ্য। তাই আমরা কেউ—ই হয়তো এই পদ্ধতিগুলো মাড়াতে চাই না।
দক্ষতা অর্জন করতে হয় পরিশ্রম করে, গবেষণা ও কাজ করে। জাতিগতভাবেই কিন্তু আমরা শর্টকাট মেথেড—এ অভ্যস্ত। এখনো চাকরি বা কোন কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈল মর্দন বা তদবীরটা বেশী কার্যকর। তাই দক্ষতা অর্জনের দরকার কী? আমাদের অনেকের মাথায়ই এটা ঘুরপাক খায়। কিন্তু যেকোনো কাজ করার সময়তো দক্ষতাটা প্রয়োজন। আর তখনই বোধ হয় শুরু হয় ফাঁকি—জুকির অভ্যাস, অজুহাত ও অফিস—রাজনীতি। কারণ, ঐ কাজের দক্ষতা আমার নাই বা কাজটা করতে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে।
আসলে জীবনের প্রতিটি পদেই দক্ষতার প্রয়োজন হয়। প্রাত:কৃত্য থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ দক্ষতা প্রয়োগের দাবী রাখে। দক্ষতা প্রয়োগ না হলে কাজটা হয়ত হবে; কিন্তু অসম্পূর্ণ ফলাফল সৃষ্টির মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটবে। কর্মী নিজেও অতৃপ্ত থাকবে। প্রতিদিন নিজের আনন্দ ও পারিবারিক পরিচিতির জন্য হলেও দক্ষতা অর্জন আবশ্যক। সন্তানাদি সমাজে পরিচিত হবে, বাবা—মায়ের দক্ষতাভিত্তিক অর্জনের মধ্যে। টেকসইভাবে অর্থ উপার্জনের জন্যও দক্ষতা অর্জন দরকার এবং তা কাজে প্রয়োগ ঘটানো একান্ত আবশ্যক।
দক্ষতাকে আমরা প্রধানত দুইভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন: সফট দক্ষতা ও হার্ড দক্ষতা। মৌলিক সফট স্কিল হলো— যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, বিশ্লেষনী চিন্তা, সমস্যা সমাধান চিন্তা, টিম ওয়ার্ক, সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
অন্যদিকে, হার্ড স্কিল এর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার জ্ঞান (এমএস ওয়ার্ড, ই—মেইল, ইন্টারনেট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, স্যোসাল মিডিয়া অপারেটিং), মার্কেটিং দক্ষতা (কাস্টমার কেয়ার, স্যোসাল মিডিয়া মার্কেটিং, নেটওয়ার্কিং, নেগোসিয়েশান), কোডিং (এপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার চলে কোডিং জ্ঞানের মাধ্যমে), ডেটা এনালাইটিক্স, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স (এআই), হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার, মেশিন লার্নিং দক্ষতা ইত্যাদি। একজন মানুষ যদি ওপরের যেকোন একটিতেও দক্ষ হয়ে ওঠে তার জন্য চাকরি পাওয়া, কাজে সফল হওয়া অত্যন্ত সহজ ব্যাপার।
পৃথিবীর অগ্রগামী দেশগুলো আসলে কোথায় আমাদের চেয়ে আগানো? মূলত তারা দক্ষতা বা জ্ঞানের জগতে আগানো। আমরা পিছনে, কারণ আমরা দক্ষতায় পিছনে। উন্নত দেশে একটি দক্ষতা যখন সেকেলে হয়ে যায়, আমাদের দেশে তখন তা শুরু হয়। যেমন: এআই আমরা শুরুই করতে পারি নাই। ল্যাবে, ক্লাসে বা কর্মক্ষেত্রে কোথাও এআই এর প্রয়োগ বাস্তবে শুরুই হয় নি। আর অন্য দেশগুলো রীতিমত এআই বিপ্লব শুরু করেছে। দক্ষতায় আমরা অনেক জায়গায় এগিয়েছি।
কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপ বা চীন তা প্রয়োগ শুরু করেছে প্রায় ২০ বছর পূর্বে। অনেক দেশের কোম্পানী বর্তমানে লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক সনদই চায় না। শুধু দেখে তার কী কী কর্মদক্ষতা আছে। বিদেশে আরও একটি জিনিষ দেখা হয়, সেটা হচ্ছে নতুন নতুন দক্ষতা শেখার আগ্রহ আছে কিনা। বিভিন্ন প্রশ্ন বা ডেমোনেস্ট্রেশনের মাধ্যমে তা জেনে নেওয়া হয়।
আমাদের দেশে বড় বড় কোম্পানীও এগুলো দেখে। কিন্তু এখানে অনেক চাকরীর একমাত্র দক্ষতা হলো তদবীর। তদবীরে যে-ই পাকা, আসলে তার কোন দক্ষতা আছে বলে মনে হয় না। আসল দক্ষতা যার আছে সে এখন বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কারণ, সে তদবীর বিদ্যায় দক্ষ হতে পারছে না, সমাজের সাথে তাল মিলাতে পারছে না। বদলি, পদায়ন, প্রমোশনের ক্ষেত্রেও তদবীরকে সমাজে প্রধান দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত আছে দক্ষিণা।
দক্ষিণা দেওয়ার মত সামর্থ্য থাকতে হবে। এইসব যোগ্যতা বা দক্ষতা থাকলে অন্য কোন দক্ষতার প্রয়োজন নাই; কালে ভদ্রে অফিসে আসলেও তার কোন সমস্যা হয় না। অফিসে না আসলেও, কাজ না করলেও গলার জোর তার—ই আবার বড় থাকে। কারণ, তার হাতটা অনেক লম্বা। তাই তদবীর দক্ষতায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি; আসল দক্ষতায় নয়।
কোন একটি অফিসে গেলেই তা প্রতিভাত হয়। প্রথম আলোর একটি রিপোর্টে দেখা গেল, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার অফিসগুলোতে সকাল ১১:১০-এও ৮০% কর্মকর্তা—কর্মচারী আসে নি। বাস্তবে সারা বাংলাদেশের চিত্রটাই কমবেশি একই I আবার কেউ যদি অফিসে আগে আসে, কাজ করে, সহকর্মীরা কানাঘুষা করতে থাকে, “উনি এতো আগে এসে কী করে?” এটাই আমাদের সমাজ।
২০২২ সালে বাংলাদেশ হতে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ৪৯,০০০ মানুষ (তথ্য: আমেরিকান এম্বাসি)। এক জরিপে দেখা যায় ৪২% তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। কারণ, আমাদের এখানে সততা, দক্ষতা বা কাজের মূল্যায়ন যথাযথভাবে নেই।
অনেকেই নিজে সফল হওয়ার জন্য, দেশে ভাল অবদান রাখার জন্য পরিশ্রম করে, টাকা খরচ করে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু হায়, দক্ষতা অর্জন যে এত বড়ো পাপ তা তার জানা ছিল না। আর তখনই বিদেশে পাড়ি জমানোর চিন্তায় সে অস্থির হয়ে যায়।
যেকোন কিছু করার জন্য লড়াই করতে হয়। কিন্তু আমি-আপনি কতক্ষণ লড়াই করবো, সবারই তো সীমাবদ্ধতা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় বড় ডিগ্রিধারী শিক্ষক আছেন। কিন্তু তাদের গবেষণা দক্ষতা নেই বললেই চলে। আবার যার আছে সে আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা কনসালটেন্সিতে ব্যস্ত। নিজের শিক্ষার্থীরা হয় তখন সৎ সন্তান।
পরিবেশ বা মূল্যায়ন না থাকার কারণে ছাত্রদের মাঝে বিসিএস ক্যাডার নামের কেরাণী হওয়ার জন্য যে দাপাদাপি দেখা যায়, গবেষণা এবং অন্যান্য দক্ষতা অর্জনে তার বিন্দুমাত্রও নেই। কারণ, তারা জানে, একবার বিসিএস ক্যাডার হতে পারলে দক্ষতার আর প্রয়োজন হয় না। লক্ষ্য তখন টাকা, সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা চর্চা করা।
শ্রেণিকক্ষে বা পরীক্ষার হলে মুখস্থ বিদ্যার যে লড়াই-সংগ্রাম দেখা যায়, অন্য ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত। যেমন: যদি বলা হয় গবেষণা শেখার জন্য এ্যাসাইনমেন্ট লিখে নিয়ে আসবে। পরদিন হতে শ্রেণিকক্ষ জনশূণ্যে পরিণতি হয়। যদি বলা হয় মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ২০ জনের একটি স্Iক্ষাৎকার নিয়ে আসো।
তখনও ক্লাস ফাঁকা হয়ে যায়। কারণ তারা এগুলো করতে আগ্রহী নয়। দক্ষতা অর্জন নয়, শর্টকার্ট মেথেডে আমরা সবকিছু পেতে চাই। দক্ষতা প্রয়োগ করে কাজে সফল হলে যে কত আনন্দ, তা কিন্তু আমরা জাানি-ই না।
এই আনন্দ যে পেয়েছে সে দক্ষতা প্রয়োগেই আনন্দ পেতে চায়। নিজের দক্ষতা থাকলে সহজেই সমাজের মানুষের উপকার করা যায়। আমি মনে করি সে উপকার করাটা এক ধরনের সাদকা। শেষ কথা, দেশকে ভালবাসলে দক্ষতা অর্জন করতে হবে এবং সেই মাফিক কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। দেশ উন্নত হলে সবাই (নতুন প্রজন্মসহ) ভাল থাকবে, নচেৎ নয়।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০২/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
