মোস্তফা কামালঃ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতির গরম মাঠে ‘নতুন শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে আন্দোলন। এবার শিশুসহ প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সময়টা একটা বড় ফ্যাক্টর। বড় লক্ষণ না থাকলেও ‘কী থেকে কী হয়ে যাওয়ার’ একটা বাতাবরণের শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। নতুন শিক্ষাক্রমকে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া মনে করার একটি পক্ষ আছে। তাদের দাবি, এক শতাংশ শিক্ষার্থীও ঠিকভাবে এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে না। এ কারিকুলামে সামগ্রিক শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় নেয়া হয়নি। শিক্ষার তাত্ত্বিক দিক এখানে উপেক্ষিত। এতে পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা হবে সার্টিফিকেটধারী শ্রমিক। অভিমত বা অভিযোগ হিসেবে এটি অবশ্যই মারাত্মক। কিন্তু আন্দোলনের জন্য নির্বাচনের আগ মুহূর্তের সময়টাকে কেন বেছে নেয়া?
শিক্ষাসূচি, পদ্ধতি নিয়ে এ দেশে কত যে এক্সপেরিমেন্ট! গত ১৫-১৬ বছরে তা আরো বাড়বাড়ন্ত-আনলিমিটেড। সৃজনশীল, এমসিকিউসহ কত কী? এমনিতেই দেশে অন্তত এগারো-বারো কিছিমের শিক্ষাব্যবস্থা ধাবমান-চলমান। আবার মাঝেমধ্যে একমুখিতার কথা বলে বহুমুখিতার প্রবণতা। আজ বৃত্তি, কাল বৃত্তি তুলে দেয়া। যখন যেটা মন চায়, সেটার পক্ষে ব্যাপক যুক্তি। আর কিছু লোকের কিছুদিন এর বিপক্ষে মাতামাতি করে ঘরে ফিরে যাওয়া। কিছু লোকের সায় দিয়ে বাহ, বাহ আওয়াজ। ওয়াজে হুজুরের কথার সঙ্গে তাল মেলানোর ঠিক ঠিক আওয়াজের মতো। কদিন বাদেই আবার সেটাই বেঠিক। হুজুর যেমন আরেক ওয়াজে গিয়ে আরেকটা বয়ান দেন। তখন সেটাও ঠিক ঠিক। বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোর বেশির ভাগই বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত বেসরকারি। এর বাইরেরগুলো খাঁটি প্রাইভেট। ছাত্র বেতন দিয়ে চলতে হয় এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তারা ফলাফলও করে ভালো। এক অর্থে ভালো ফলাফলই তাদের পুঁজি ও পরিচিতি।
কিছু উদ্দেশ্য সামনে রেখে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়াভাবে ছাত্র ভর্তি ও পাসের হার বাড়িয়েছে। নানা কোটাও চালু করেছে। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়িয়েছে। এতে অনেক খরচের দাবি করা হয়েছে সরকারি তরফে। আসলে খরচটা কি খুব বেশি ছিল? করোনার আগে ২০১৯ সালে সরকার প্রাথমিক স্তরে টেলেন্টপুলে বৃত্তি দিয়েছে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীকে। আর সাধারণ গ্রেডে ৪৯ হাজার ৫০০ জনকে। এতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে টেলেন্টপুলে খরচ হয়েছে ৯৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি মিলিয়ে টেলেন্টপুলে বছরে খরচ ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সাধারণ গ্রেডে বছরে খরচ ৩ কোটি ৩৪ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে ২০১৯ সালে জুনিয়র স্তরে টেলেন্টপুলে বৃত্তি দেয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ জনকে। সাধারণ গ্রেডে ৩১ হাজার ৫০০ জনকে। এতে জু২িনয়র স্তরে (নবম-দশম শ্রেণিতে) বৃত্তি বছরে ৩ কোটি ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। হিসাব একদম পরিষ্কার। এ হিসাবে ২০১৯ সালে প্রাথমিক ও জুনিয়র মিলিয়ে সারাদেশের সাধারণ অভিভাবকের প্রায় দেড় কোটি সন্তানের মেধা বৃত্তিতে সরকারের ৯ কোটি ৫২ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ কি অনেক টাকা? ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কোনো কোনো মাঠ নেতার বছরে আয়-ব্যয়ের হিসাবও এর চেয়ে বেশি।
শিক্ষার্থীদের পঠিত বিষয়-আশয়ের একটা আলাপও এখানে হয়ে যেতে পারে। মাধ্যমিক স্তরে ধারাবাহিকভাবে নতুন বিজ্ঞান বই চালু করা হয়েছিল ১৯৮১ সাল থেকে। সেখানেও কমানোর প্রকল্প। ধরা যাক, ১৯৮১ সাল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞানের কথা। বইটির প্রথম অধ্যায়-পরিমাপ। মোট বরাদ্দ ১৪ পৃষ্ঠা, অনুশীলনী ৩ পৃষ্ঠা। টেক্সট আলোচনা ১১ পৃষ্ঠা। ১১ পৃষ্ঠার টেক্সটে ল্যাবে বা হাতে-কলমে বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক করার কাজ ছিল ১৩টি, যার শিরোনাম ছিল ‘এসো নিজে করি’ এবং যার বর্ণনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ পৃষ্ঠা। বাকি ৩ পৃষ্ঠা তত্ত্ব, তথ্য ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। ওইসব ‘নিজে করি’র কাজে ল্যাবে যেতে হবে বা ল্যাব উপকরণ খরচ বাস্তবে ছিল না। যে যেভাবে পেরেছে নিজে নিজে করেছে। পাস করেছে। পুরোটা এক ধরনের তামাশার মতোই।
শিক্ষা অন্য কটি খাতের মতো নয়, তা মনে না রাখলেও যেন কারো সমস্যা হচ্ছে না। যে কোনো কারিকুলাম প্রণয়ন, টেক্সট উপস্থাপন, অনুশীলন নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও অন্যান্য সব ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো সবার আগে বিবেচনা করা হয়। পাঠ পরিকল্পনা ছিল প্রথমত প্রান্তের ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞানে পিছিয়ে দেয়া এবং দ্বিতীয়ত হলো তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, কাঠামোগত সংস্কার ইত্যাদির নামে ব্যাংক ও বাণিজ্য খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে লোকবল সরবরাহ বাড়াতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমিয়ে বাণিজ্যতে সরিয়ে নেয়া, সে কারণে এসব প্রশ্ন একেবারেই বিবেচনা করার সুযোগ পরিকল্পনাকারীদের ছিল না, সরকার বা বিশেষজ্ঞদেরও ছিল না। আর যেহেতু বিজ্ঞান শাখা বন্ধ করে দিলে বা খোলার অনুমতি না দিলে সামাজিক প্রতিক্রিয়া হবে, শাখা খোলা ও ল্যাব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ব্যবসাও কম হবে, ফলে সেই নেতিবাচক পথ পরিহার করা ছিল খুবই যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। ফলে আশির দশকের শুরুতে এসএসসিতে বিজ্ঞান শাখার যত শিক্ষার্থী ছিল, সব দিক বিবেচনা করে সেই সুন্দর বইটা দিয়ে নব্বই দশকের শুরুতেই তার প্রায় অর্ধেক কমানো সম্ভব হয়। এরপর আবার সেই বই ইভালুয়েশন করে বাতিল করে ভিন্ন বিজ্ঞান বই প্রণয়ন করা হলেও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা আর ফিরে আসেনি। ক্লাস নাইন-টেনে গণিত-বিজ্ঞান একটুও কমছে না বরং বাড়ছে- তবে গণিত-বিজ্ঞানের ভয়ে বা অপছন্দ থেকে যে ৩ ভাগের ২ ভাগ শিক্ষার্থী বাণিজ্য বা কলা শাখায় যেত, তারা এখন কীভাবে উত্তীর্ণ হবে? নাকি ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ একটা মার্কা দিয়ে দিলেই হবে প্রশ্ন ফাঁস আর শতভাগ পাসের মতো করে? এ ধরনের অনেক প্রশ্ন থাকলেও জবাব নেই। জবাব দিতেও হয় না। এখনো হচ্ছে না। ভবিষ্যতেও হয় কিনা, কে জানে!
দফায় দফায় বদলানো একটি শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনও পল্টনি সমাবেশের ঘোষণার মতো হুট করে হয়ে যায়নি। বাজেট হয়েছে, কিছু বৈঠক হয়েছে। খানাপিনা, টিএ-ডিএ ধরনের টুকটাক মওকা মিলেছে। গবেষণা তো হয়েছেই। কিন্তু সেই গবেষণা প্রতিবেদনগুলো কই? মানুষ গড়ার কারিগর প্রকৃত শিক্ষক, পাঠদানে অভিজ্ঞ, সময়োপযোগী শিক্ষা নিয়ে ভাবেন এমন কজনকে রাখা হয়েছিল ওই ভাবনা-গবেষণায়? বলা হয়ে থাকে মাছের পচন শুরু মাথা থেকে, আর জাতিকে বিনাশের চক্রান্ত শিশুদের বিনাশ থেকে। এটা প্রবাদ হয়েই থাক। নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক কিছু শিখুক না শিখুক গুগল মামার সহায়তায় বহু কঠিন প্রশ্নের জবাবও দিতে পারছে। গুগলে তারা বিভিন্ন কাজ কপি করে জমা দিচ্ছে। কারিকুলামে বিজ্ঞান ও গণিতের পরিসর সংকোচন করায় বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রার্থীদের সুযোগ কমে গেছে অবধারিতভাবে। অথচ বলা হচ্ছে বিদেশের সঙ্গে মিল রেখে আমাদের কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। শুনতে ভালো লাগার মতো। আমাদের শিক্ষকদের মান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শ্রেণিকক্ষ সংখ্যা কোনোটিই কি বিদেশের মতো অবস্থায় আছে? এ প্রশ্ন করলে তৎক্ষণাৎ সরকারবিরোধী গাল শুনিয়ে দেয়া হয়।
প্রাথমিক স্তরে যেভাবে বই বানানো হচ্ছে, শিখন শেখানো হচ্ছে, মাধ্যমিক স্তর সেভাবে নয়। দুস্তরে মিলের বদলে চরম গোঁজামিল হচ্ছে। নয়া কারিকুলামে গ্রামের কৃষক-শ্রমিকের সন্তানের কথা কতটা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে বেচারা শিক্ষকরা তা হাড়ে হাড়ে মালুম করলেও ভয়ে কিছু বলেন না। পাছে লোকাল কোনো নেতা বা আতিপাতি এসে তাকে সরকারবিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে চাকরিটা খেয়ে ফেলে। ঢাকা বা নগরীর শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান পরীক্ষায় বাসার এসি-ফ্রিজের মতো যে কোনো একটি ডিভাইসের ওপর পোস্টার বানিয়ে নিতে বলা হলে সে ইন্টারনেট দেখে দেখে পোস্টার বানিয়ে দেয়। কখনো কখনো বানানও লাগে না। গুগল মামাই বানিয়ে দেয়। কিন্তু গ্রামের একটা শিক্ষার্থীর পক্ষে গুগল মামার দেখা পাওয়া কঠিন। এ ধরনের ডিভাইস বা ইন্টারনেট সার্ভিস সে পাবে কোথায়?
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলে জ্ঞানী ভাব করা যায়। কিন্তু কথিত এ শিক্ষা হাছিলের পর মেরুদণ্ডটির কী হাল হচ্ছে? আগের মতো পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পড়ায় আগ্রহ কমেছে। গাইড বইও লাগছে না। সারা বছর শ্রেণিকক্ষের বাইরে হাতে-কলমে শিক্ষা আর বছর শেষে সামষ্টিক মূল্যায়নেও পাঠ্যবইয়ের নেই তেমন কোনো গুরুত্ব। গুগল মামার সঙ্গে খাতির থাকলেই হয়ে যাচ্ছে। গুগলের সঙ্গে খায়খাতির হওয়া শিক্ষার্থীরা দীর্ঘসময় অনলাইনে থাকছে। একজন শিক্ষার্থী কোন সাইটে যাচ্ছে, কী দেখছে- তা খেয়াল রাখা অভিভাবকের পক্ষে কতক্ষণ সম্ভব? নয়া কারিকুলামে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে জিম্মি। সম্পূর্ণ মূল্যায়ন শিক্ষকের হাতে। এসবের যোগফলে শিক্ষার্থীরা যে সার্টিফিকেটধারী শ্রমিক হয়ে চলছে এর জের কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বুঝতে অতি জ্ঞানী হওয়া লাগে না। যেসব ইন্ডিকেটরে বাচ্চাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটি প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযোজ্য- এমন মন্তব্য করার অভিভাবকও আমি পেয়েছি। নতুন এ কারিকুলামে তাদের ব্যয়ও বাড়ছে। প্রতিদিন কাগজ, কলম ও পেন্সিলের পাশাপাশি নতুন নতুন সরঞ্জাম যুক্ত করা হচ্ছে।
চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রমে তারা যা পড়ছে মন্ত্রী-আমলা-এমপিসহ বনেদিদের সন্তানরা কি তা পড়বে? উত্তর ‘না’ হলে এই কারিকুলামে কারা পড়বে? কাদের জন্য এই সমন্বিত শিক্ষাক্রম? যে দই ঘোষ নিজে খায় না, তার পরিবার বা আত্মীয়স্বজনকে খাওয়ায় না, অথচ ‘ভালো ভালো’ বলে লাফানোর একদল আছে। থাকে। এই লাফানোরাও সেই দই খায় না। নাচে-লাফায় শুধু কিছু সরল নিরুপায় লোকদের বোকা বানাতে।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
