খুলনাঃ ২৫ নভেম্বর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রমের ৩৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৯১ সালের এদিনে শিক্ষাকার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রতিবছর এ দিনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আপামর মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও ত্যাগ। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালের ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা হয়। ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯০’ পাস হয়, যা গেজেট আকারে প্রকাশ হয় ওই বছর ৩১ জুলাই। এরপর ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ৪টি ডিসিপ্লিনে ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এখানে জীববিজ্ঞান, বিজ্ঞান প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা, কলা ও মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, চারুকলাসহ অন্যান্য অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল বা অনুষদের সংখ্যা ৮টি এবং ডিসিপ্লিন বা বিভাগের সংখ্যা ২৯টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি। যার মধ্যে ৩৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষক আছেন পাঁচ শতাধিক, যার এক তৃতীয়াংশই পিএইচডি ধারী। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১৪। ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত ৫৪:৪৬ যা দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কর্মকর্তা তিন শতাধিক এবং কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচশত। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৬টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার গ্র্যাজুয়েটকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিজ্ঞানপত্র প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পর গত ৩৩ বছরে এখানে কোনো ছাত্র সংঘর্ষ, হানাহানি বা রক্তপাত হয়নি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। দেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট, সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে। তাহলো: ‘খবধৎহ, খবধফ ধহফ খরাব’ যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘শিখুন, নেতৃত্ব দিন এবং বাঁচুন’। এছাড়া নতুন ভিশন, মিশন এবং রিসার্চ স্ট্র্যাটেজি প্ল্যান নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নেই, সেশনজট নেই। তবে শিক্ষার্থীদের ৩২টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। যার সাথে সম্পৃক্ত থেকে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, দক্ষতা ও সাংগঠনিক মনোবল অর্জন করে। তারাই সারাবছর উৎসবমুখর রাখে ক্যাম্পাস। শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রক্তদানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, খেলাধুলার জন্য আন্তডিসিপ্লিন ক্রিকেট, ফুটবল টুর্নামেন্ট ছাড়াও অ্যাথলেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। উপসানালয় হিসেবে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, রয়েছে মন্দির।
বর্তমান সরকার দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে ইতোমধ্যে হেকেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও শিক্ষার মান যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয় সেজন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল স্থাপন করেছে। এই কাউন্সিল ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক- বিএনকিউএফ এর গাইডলাইন অনুসরণ করে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে বিশ্বমানের আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। গত জানুয়ারি থেকে প্রণীত ওবিই কারিকুলা এবং একই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্সে ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবিকাশের ধারায় এখন শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনায় বিশ্বমান অর্জনে জোর দেওয়া হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে রিসার্চ ফোকাস্ড ইউনিভার্সিটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গবেষণার গুণগত মানোন্নয়নে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর আন্তর্জাতিক র্যাংকিং, কিউএস র্যাংকিং, টাইমস্ হায়ার এডুকেশন র্যাংকিং এ স্থান করে নিয়েছে। এছাড়াও এবছর ইউজিসির এপিএ মূল্যায়নে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ ৯৫.৪৭ নম্বর পেয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটালাইজেশনের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, একাডেমিকসহ সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করতে ডি-নথি চালু, সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্পের আওতায় হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যাকবোন, সিকিউরিটি সার্ভিলেন্স সিস্টেম স্থাপন এবং আধুনিক সুবিধা সম্বলিত স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন, আবাসিক হলের সিট বুকিং, অ্যাপস্ ব্যবহার করে ঢাকাস্থ গেস্ট হাউজের রুম বুকিং, অনলাইনে চাকরির আবেদন, আধুনিক সুবিধা সম্বলিত প্রশিক্ষণ কক্ষ, ল্যাব উল্লেখযোগ্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শীঘ্রই স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিলাইজেশনের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর অবকাঠামো উন্নয়ন (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু অবকাঠামোর নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট জয়বাংলা একাডেমিক ভবন, ৫ তলা আইইআর ভবন, ৪ তলা বিশিষ্ট মেডিকেল সেন্টার, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের পার্শ্ব ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, টিএসসি ভবন, জিমনেশিয়াম কমপ্লেক্স, আবাসিক ভবন, দৃষ্টিনন্দন মেইনগেট, সীমানা প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ভবনের ছাদে ২১৬টি সোলার প্যানেল বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যা থেকে ১১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ৩০০ কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল ও অন্যান্য বড় স্থাপনার ছাদেও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন প্রধান গেট নির্মাণ কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের অধিকতর আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে নতুন হল তৈরি, প্রশাসনিক, একাডেমিকসহ সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করতে সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার এর আওতায় হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যাকবোন, সিকিউরিটি সার্ভিলেন্স সিস্টেম স্থাপন এবং স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করার উদ্যোগ, নিয়মিত জাতীয়/আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, জীববিজ্ঞান স্কুলের জন্য গ্রিনহাউস স্থাপন, কেন্দ্রীয় গবেষণাগারকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত করার লক্ষ্যে আইএসও সার্টিফাইড করা উদ্যোগ, খেলার মাঠের উন্নয়ন, আবাসিক হলসমূহে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব তৈরি, সার্বিক কাজে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবাসনের সুবিধার্থে ইন্টারন্যাশনাল হল/ডরমেটরি তৈরি, সুন্দরবনের উপর বিশ্বমানের রিসার্চ করার জন্য যুগোপযোগী সেন্টার তৈরি। এছাড়াও জীববিজ্ঞানভিত্তিক ৭টি বিভাগসমূহের জন্য মাঠ গবেষণারে প্রয়োজনীয় জমিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী একশত বছরের চাহিদা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিরিখে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ২০৩ একর জমি অধিগ্রহণ, আরও ৩০০ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুতের মোট চাহিদার ৪০% পূরণ, রিসার্চ ইনফরমেশন সেন্টার ডেস্ক তৈরি, সেন্ট্রাল কম্পিউটিং ল্যাব নির্মাণ, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. মাহমুদ হোসেন বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এতদঞ্চলের মানুষের অপরিসীম অবদান ও ত্যাগ অনস্বীকার্য। আমরা সবসময়ই সে বিষয়টি ধারণ করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধারণ করেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অভিলক্ষ্য পূরণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে গড়ে তুলতে ডিজিটালাইজেশনের পথে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে আস্থার জায়গা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। এটা ধারণ করেই এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমান অর্জনের পথে এগিয়ে যাবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখার মেলবন্ধনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গরূপ পরিগ্রহের পথে। এ বিশ্ববিদ্যালয় শীঘ্রই শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্ব পরিমণ্ডলে আলো ছড়াবে; সে প্রত্যাশার সাথে আজ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৩ এর এই শুভক্ষণে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২২/১১/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
