এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৌচাগারের প্রতি কেন এত অবহেলা

ওবায়দুল্লাহ সনি: বাঙালি নারীরা শিক্ষায় এখন অনেকটাই এগিয়েছে। এ কথাও অস্বীকার করার কোনো সংগত যুক্তি নেই যে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও উচ্চশিক্ষায় তারা এখনো বেশ পিছিয়ে। প্রাথমিকে পড়ার পর নয় বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই অনেক অভিভাবক মেয়েদের আর বিদ্যালয়ে পাঠান না। গ্রামাঞ্চলে ৪০ শতাংশ মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর আগেই স্কুল ছেড়ে দেয়। মাত্র ১০-১২ শতাংশ দ্বাদশ পর্যন্ত পাঠ শেষ করে। মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণেই এ চিত্র। এর মধ্যে শৌচাগার সংকট অন্যতম। সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি ওঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্রীদের জন্য পৃথক শৌচাগার রয়েছে মাত্র ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৬৭ শতাংশ ছাত্রীই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর মধ্যে আবার ১৮ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শৌচাগারই নেই।

বেসরকারি সংস্থা ডরপের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রায় দুই কোটি ছাত্রীর মধ্যে মাত্র ২০ ভাগ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করতে পারছে। বাকি ৮০ ভাগ মেয়েই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঋতুকালীন গড়ে মাত্র ১০ শতাংশ স্কুলছাত্রী স্যানিটারি প্যাড কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ পায়। অন্যরা পুরনো কাপড় বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে যা অনেক ক্ষেত্রেই অনিরাপদ। আবার এ সময় শৌচাগার অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে বেশির ভাগ মেয়ে মাসের চার-পাঁচদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে। এতে করে ক্লাসের পাঠ থেকে তাদের পিছিয়ে পড়তে হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজনীয় উপস্থিতি না থাকায় অনেক ছাত্রী উপবৃত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়।

কলেজ জীবনের প্রথম দিনটা কখনই ভুলবেন না রুমানা আক্তার (ছদ্মনাম)। কী অস্বস্তির মধ্যেই না সেদিন পড়েছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি এখন সরকারের একটা বাহিনীতে কাজ করছেন। ওইদিনটির স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘ক্লাসের ফাঁকে বাথরুমে গিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়েছিলাম। নোংরা আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। দেখেই মনে হচ্ছিল নিয়মিত পরিষ্কার হয় না। দুর্গন্ধে বমি আসছিল। বিদ্যুতের বাল্ব শেষ কবে লাগানো হয়েছে কেউ বলতে পারবে না। খুব জরুরি হওয়ায় ভাঙা দরজাটা কোনো রকমে টেনেটুনে লাগাতেই টয়লেটের ভেতরটায় নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যেই দ্রুত বাথরুম সেরে বের হতেই দেখি বেশ কয়েকজন ছাত্র ঢুকছে। পরক্ষণেই বুঝতে পারি এটি কমন বাথরুম। মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই।’ সে চিত্রের পরিবর্তন হয়নি এখনো। দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রায় একই। এতে করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে শিক্ষার্থীরা। মেয়েদের সমস্যা হয় সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ঋতুকালীন তারা বিদ্যালয়ে যেতে চায় না কোনো ব্যবস্থা না থাকায়। আবার স্কুলের সময়টায় যেন টয়লেটে যেতে না হয়, সেজন্য তারা পানিও কম পান করে।

স্যানিটেশন উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও কোথাও কোথাও রয়ে গেছে সমন্বয়হীনতা। ফলে অগ্রগতির সুফল তো মিলছেই না, উল্টো শুদ্ধাচারের অভাবে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এখন উন্নত টয়লেটের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে সেটার রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতও যে নিয়মিত করতে হবে। স্যানিটেশনের বিষয়ে শিক্ষকরা সচেতন হলেও তারা এখনো জানেন না এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কী। অন্যদিকে স্কুলের ফান্ডে অর্থ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনা কমিটি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট উদাসীন। কোনো রকমে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেই দায় সারতে চায়। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার নিয়ে তখন ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পলিসি সাপোর্ট ইউনিটের উদ্যোগে ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে করেছিল আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি)। স্বাস্থ্যবিধিচর্চার বিষয়ে ধারণা পেতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে করা এ জরিপে সহযোগিতায় ছিল ওয়াটার এইড বাংলাদেশ। এতে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় গড়ে ১৮৭ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে একটি শৌচাগার, যেখানে সরকারি মানদণ্ডে প্রতি ৫০ ছাত্রীর জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। আবার স্কুলগুলোর ৫৫ শতাংশ টয়লেট তালাবদ্ধ থাকে। খোলা থাকাগুলোর মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যবহারের উপযোগী। এছাড়া ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচাগার আছে কেবল ১১ শতাংশ বিদ্যালয়ে। আর ঋতুকালীন ব্যবস্থাপনা রয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ স্কুলে। তাই ৮৬ শতাংশ ছাত্রীই এ সময় বিদ্যালয়ে আসতে চায় না।

ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রতি পাঁচটি স্কুলের মধ্যে একটিতে নিরাপদ ও সুপেয় পানির ঘাটতি রয়েছে, যা মোট স্কুলের ১৯ শতাংশ। এ কারণে ৮৫ লাখ শিশু শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর ৭ শতাংশ শিক্ষালয়ে পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা সুবিধা একেবারেই নেই। এর মানে হলো, দেশের ৩০ লাখ শিশুর জন্য তাদের স্কুলে নেই নিরাপদ পানি, ওয়াশরুম ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। জরিপটিতে আরো বলা হয়েছে, ৪০ শতাংশেরও বেশি স্কুলে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে ১ কোটি ৯ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নেই ৪৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে। সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার মতো মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ঘাটতিও রয়েছে ৪৪ শতাংশ স্কুলে।

এসব চিত্র দেখে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা করতে বলে সরকার। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০১৫ সালে একটি পরিপত্রও জারি করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, ছাত্রীদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা, ঢাকনাযুক্ত প্লাস্টিকের পাত্র রাখা, ঋতুকালীন বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একজন শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেয়া, প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখতে হবে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা মানছে না। এজন্য অবশ্য স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে।

ন্যাশনাল হাইজিন ব্যাস লাইন সার্ভে এবং ইউনিসেফের তথ্যানুসারে, নোংরা থাকায় বাংলাদেশের বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযুক্ত। অথচ বছরের পর বছর এ অবস্থা চলার পরও সবাই নিশ্চুপ। এ নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষকসহ জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারক মহলও নির্বিকার। কারণ অনেকের কাছে শৌচাগার ব্যবহার বা টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কথা বলা মানে ‘নোংরামি’, যা সবার সামনে তুলে ধরাকে লজ্জার বিষয় বলে মনে করা হয়।

শুধু গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলেই নয়, রাজধানীর অনেক নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও স্যানিটেশনের সমস্যা রয়েছে। এসব স্কুলে উন্নত শৌচাগার থাকলেও মূলত নিয়মিত যত্ন ও দেখভালের অভাবে তা আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। তখন শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই এগুলোর ব্যবহার এড়িয়ে চলে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের ভবন তিন-চার তলাবিশিষ্ট হলেও প্রতি তলায় শৌচাগার নেই। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে অন্য তলায় গিয়ে বাথরুম সারতে হয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদেরও তাই করতে হয়। অথচ ভবন নির্মাণের সময়ই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি তলায় টয়লেট নির্মাণ বাধ্যতামূলক।

স্কুলে শৌচাগার থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগ। অথচ মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলে লেখাপড়া শেষ করার হার, বিশেষ করে শিক্ষা সমাপনীর হার এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল আনে। ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আলাদা শৌচাগার থাকায় ক্লাসে মেয়েদের উপস্থিতি ১০ শতাংশ এবং ঋতুকালীন সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ থাকলে উপস্থিতি বাড়ে ২০ শতাংশ। এর ফলে মেয়েদের বাল্যবিয়ের হারও কমে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের কারণে দেশের দুই কোটি শিশু টাইফয়েড, জন্ডিস, কলেরা বা ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। স্কুলের ছেলেরা নোংরা শৌচাগার কোনোমতে ব্যবহার করতে পারলেও বিপাকে পড়ে মেয়েরা। তখন তাদের প্রস্রাব চেপে রাখতে হয়। এতে করে ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা ইউটিআই হতে পারে, যাকে বলে মূত্রনালির সংক্রমণ। পরবর্তী সময়ে এটা অন্য সমস্যা তৈরি করে। যেমন বারবার যদি কারো ইউটিআই হয়, তাহলে তার নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আমার এক আত্মীয় রয়েছেন পেশায় যিনি চিকিৎসক। পারিবারিক এক আড্ডায় তার সঙ্গে শিক্ষালয়ে শৌচাগারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি তখন বলছিলেন, তাদের কাছে প্রচুর রোগী আসে, যারা স্কুল-কলেজের ছাত্রী। পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে মূলত তারা ইউরিন ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়। ফলে জ্বর, পেটব্যথা ইত্যাদি সমস্যা তাদের লেগেই থাকে। অনেকের শরীরে পানিশূন্যতাও দেখা দেয়। প্রস্রাবে ইউরিয়া ও অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো টক্সিন জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে বেশিক্ষণ চেপে রাখলে বিষাক্ত পদার্থ কিডনিতে পৌঁছে পাথর তৈরি করতে পারে। শহুরে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই ইদানীং এ রোগে আক্রান্তের হার বাড়ছে। আবার পিরিয়ডকালীন প্রয়োজনে শৌচাগার ব্যবহার না করলে মূত্রথলির পাশাপাশি জরায়ুর ইনফেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শিক্ষালয়গুলোর কাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো কিন্তু স্যানিটেশন ও হাইজিন খাতের উন্নয়নে রয়েছে চরম অবহেলা। নতুন স্কুলভবনে শৌচাগার থাকলেও তা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নেই লোকবল। নিজস্ব বাজেটেও এ খাতে বরাদ্দ খুবই নগণ্য। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবকদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সবার অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আর সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর মনিটরিংয়ের পাশাপাশি বাড়াতে হবে বাজেট। কেননা একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নটা সবার আগে দরকার। এক্ষেত্রে নোংরা শৌচাগার বড় বাধা।

লেখকঃ সাংবাদিক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৭/১১/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.