এইমাত্র পাওয়া

দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

ড. ইজাজ আহসানঃ একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান ভূমিকা পালন করে জনশক্তি। আমরা জানি উৎপাদনের চারটি উপাদান; যেমন ভূমি, শ্রম, মূলধন এবং উদ্যোক্তার একটি হলো শ্রম। অনেক দেশ আছে, যাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি নেই। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রয়েছে শ্রমিকের অভাব। রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন শ্রমিকের। তাদের এই অভাব পূরণ হচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শ্রমিকের দ্বারা। আমেরিকা দু শ বছর আগে সুদূর আফ্রিকা থেকে দলে দলে জাহাজভর্তি শ্রমিক দাস হিসেবে নিয়ে এসেছিল তাদের শ্রমিকের অভাব পূরণের জন্য। আরও পেছনে গেলে মিসরের পিরামিড ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরি হয়েছিল যুদ্ধবন্দী ও ক্রীতদাস শ্রমিকদের দিয়ে। সেই লোমহর্ষক করুণ কাহিনিগুলো এখনো আমাদের শিহরিত করে।

তাই এটা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না যে, কোনো উন্নয়ন বা অগ্রগতির জন্য শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা কতখানি। অর্থনীতিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়, যখন দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ে। প্রশ্ন হলো, শুধু কর্মক্ষম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই কি উন্নয়ন সম্ভব? উত্তর হলো, ‘না’। কেননা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যদি দক্ষ না হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব না। দক্ষতা না থাকার কারণে এই জনগোষ্ঠী বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়ায়। দেশে বেড়ে চলে বেকারত্ব। সেই জনগোষ্ঠী তখন দেশের সম্পদের পরিবর্তে বোঝা হয়ে যায়।

দক্ষতার ভিত্তিতে শ্রমিককে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; দক্ষ ও অদক্ষ। শ্রমবাজারে দুই শ্রেণির শ্রমিকেরই চাহিদা বিদ্যমান। কিন্তু চাহিদার বিচারে বর্তমান বিশ্বে অদক্ষ শ্রমিকের তুলনায় দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি। দক্ষতা কোনো জন্মগত বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জিনিস নয়। দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যম হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। এখন তাহলে মনে হতে পারে, যেকোনো শিক্ষাই মানুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে। মূলত সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা কেবল শিক্ষিত বেকার তৈরি করে; দক্ষতা সৃষ্টিতে কোনোভাবেই ভূমিকা রাখে না। কথাটা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেই বলা। বাংলাদেশ এক বিশাল জনসংখ্যার দেশ। এখানে রয়েছে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির এক বিপুল ভাণ্ডার। এই জনশক্তির একটা বিরাট অংশ কর্মহীন বেকার জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

পরিতাপের বিষয়, এই জনশক্তির একটা অংশ আবার শিক্ষিত বেকার। শিক্ষিত হওয়ার পরও কেন বেকার? একটা কারণ তো যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না থাকা। বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় কর্মসংস্থান অনেক কম। স্বাভাবিকভাবেই এটা বেকারত্বের বড় কারণ। কিন্তু তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো অদক্ষতা। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে অদক্ষ শ্রমশক্তির সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশের প্রচুর অদক্ষ শ্রমিক দেশে–বিদেশে কর্মরত। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আছে সব থেকে বেশি।

অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি ও চাহিদা আমাদের এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। মূল আলোচ্য বিষয় হলো আমাদের উচ্চশিক্ষার মান এবং শিক্ষিত বেকার সমস্যা নিয়ে।

কথা হলো এমনটা হচ্ছে কেন? আমাদের দেশে এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শখানেকের বেশি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শ্রমবাজারে পা রাখেন। তারপর একটা চাকরির আশায় বছরের পর বছর পার করে দেন। আমাদের ধারণা চাকরির বাজার মন্দা। কথাটা আংশিক সত্য। কেননা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ব্যবস্থাপনায় দক্ষ লোক নিয়োগ বাবদ বছরে বাংলাদেশকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা থেকেও উচ্চপদে যথেষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োজিত আছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। দেশে যদি দক্ষ জনবল থেকেই থাকে, তবে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে কেন? তাও যদি জাপান, ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে আনতে হতো, তাহলে কথা ছিল। যাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যলয়গুলো থেকে প্রধানত বিবিএ, এমবিএ এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেওয়া হয় ঢালাওভাবে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশের নেই নিয়মিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। আর অন্যান্য সুযোগ—সুবিধার কথা তো বাদই দিলাম। সুতরাং এই অবস্থায় তাদের কাছ থেকে শুধু সার্টিফিকেট ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার থাকে না ।

বর্তমানে শ্রমবাজার শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষ জনশক্তির চাহিদা এখন পৃথিবীব্যাপী। যদি দক্ষ কর্মমুখী জনশক্তি গড়ে তোলা যায়, তবে দেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ আছে। এখন তথ্য–প্রযুক্তির যুগ। যারা তথ্য–প্রযুক্তিতে নিয়ে পড়ছে, তাদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের হলে দেশে–বিদেশে কর্মসংস্থানের কোনো অভাব হবে না, এটা প্রমাণিত।

ভারত এ ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমেরিকার সফটওয়্যার ও প্রোগ্রামিং খাতে ভারতীয়দের আধিপত্য সুস্পষ্ট। এর পেছনে ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান আছে। তারা বিশ্বমানের তথ্য–প্রযুক্তিবিদ তৈরি করে চলেছে। যেমন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গ্র্যাজুয়েটদের নাকি বিনা বাক্য ব্যয়ে আমেরিকার ভিসা দেওয়া হয়। কথাটার সত্যতা জানি না। তবে এটুকু জানি, তারা ওই দেশের সফটওয়্যার খাতে অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আমরা এই মাপের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। উপরন্তু উচ্চশিক্ষা ক্রমান্বয়ে সার্টিফিকেট সর্বস্ব হতে চলেছে।

উচ্চশিক্ষা ছাড়াও বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ উচ্চশিক্ষার তুলনায় খুবই সীমিত। দেশের জনশক্তির একটা বিরাট অংশকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে বেকারত্ব ঘোচার পাশাপাশি দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে। কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের মজুরির পার্থক্য প্রায় তিন থেকে চার গুণ। দেশ থেকে যে শ্রমিকেরা বিদেশে পাড়ি জমায়, তাদের অধিকাংশই অদক্ষ । এর পরিবর্তে যদি দক্ষ শ্রমিক পাঠানো যায়, তবে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে বহুগুণ বেশি।

তাই এখন সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে নিজ নিজ পেশায় দক্ষ ও পেশাদার কর্মী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে, ঘুচবে বেকারত্বের অভিশাপ।

লেখকঃ  গবেষক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৬/১০/২০২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.