ড. মো. মাহমুদুল হাছানঃ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে পঠন-পাঠন প্রক্রিয়ায় নিবিড় তত্ত্বাবধান ও যত্নশীল আচরণের মাধ্যমে। একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের আদর, সোহাগ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, গভীর মনোনিবেশ ও অকৃত্রিম বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করে থাকেন, যেখানে শাসন-অনুশাসন থাকে তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে।
শিক্ষকদের আচরণিক ফলাবর্তনে কেউ হয়ে থাকেন অতি সহজ-সরল, কেউ কর্কশ ও রূঢ়, কেউ স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী, আবার কেউবা হয়ে থাকেন স্রেফ বন্ধু। শিক্ষকতা পেশায় এ আচরণগুলোর কোনোটিই কল্যাণকর নয়। শিক্ষককে হতে হবে অনুপম আদর্শের অধিকারী বন্ধুসুলভ (Friendly) শিক্ষক। বন্ধু (Friend) ও বন্ধুসুলভ (Friendly) শব্দদ্বয় একই শব্দমূল থেকে উদ্ভূত হলেও শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে বন্ধুসুলভ গুণটি খুবই জুতসই ও যথার্থ।
বন্ধুসুলভ শিক্ষক তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই আচরণ করেন, তবে কখনো সেটি বন্ধু পর্যায়ে যেতে পারে না। কারণ বন্ধুর সম্পর্কের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মোহ জড়িত থাকে, কিন্তু বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্কের সঙ্গে শিক্ষকের নিঃস্বার্থ মনোভাব, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মত্যাগের বিষয়টি ব্যাপকভাবে জড়িত। একজন বন্ধুসুলভ শিক্ষক প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষকের নির্দেশনা এবং বন্ধুর উপলব্ধি উভয়ই একত্রিত করে পাঠদান করতে পারেন।
একজন শিক্ষক বন্ধুসুলভ হলে তিনি তার আচার-আচরণ ও যোগাযোগ দক্ষতায় অতীব ভদ্র, নম্র ও শালীন হয়ে থাকেন। সব শিক্ষার্থীই তার দৃষ্টিতে সমান হন এবং সবার সঙ্গে তিনি পক্ষপাতহীন আচরণ করেন। কিন্তু শিক্ষক যদি কখনো বন্ধু বনে যান, তাহলে তিনি তার আচরণেই বিভেদ তৈরি করে ফেলেন এবং তার মধ্যে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও একপেশে নীতি অবলম্বন করার মানসিকতা তীব্র হয়। তিনি সবাইকে সমান চোখে দেখতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং জীবনের ক্যারিয়ার গঠনে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
সুতরাং প্রত্যেক শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুসুলভ আচরণের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত। তাহলে এ ধরনের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো শিক্ষাবিদ হিসাবে নিজেকে প্রমাণিত করতে পারবেন। বন্ধুসুলভ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আদর্শ জীবন গঠনের মহান কারিগর। এসব শিক্ষকের শিক্ষা কৌশলে শিক্ষার্থীদের বিকাশধর্মী বেশকিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, যেমন-১. বন্ধুসুলভ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করেন। তারা শিশুদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ, শুভ চিন্তাচেতনার উদ্রেক ও উচ্চ মনমানসিকতা তৈরিতে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। বন্ধুসুলভ শিক্ষকরা শ্রেণি পাঠদানের পরও শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিতে আনন্দবোধ করেন। তবে শিক্ষার্থীদের থেকে সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখা এবং কখনোই বন্ধু না হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২. প্রায়ই দেখা যায়, ছাত্রছাত্রীরা বন্ধুসুলভ শিক্ষকের ক্লাসে উন্মুক্ত আলোচনায় শরিক হয়। এমনকি একজন অন্তর্মুখী ছাত্রও বন্ধুসুলভ শিক্ষকের সাহচর্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। শ্রেণিতে খোলামেলা আলোচনা ও উন্মুক্ত অংশগ্রহণ একজন শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক, কারণ এতে তারা নতুন ধারণা এবং মতামত প্রদান ও গ্রহণ করতে শেখে। ৩. বন্ধুসুলভ শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি লালিত বন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এ ধরনের শিক্ষক নিঃসন্দেহে এমন হয়ে থাকেন, যাদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা তাদের মিস করেন। ৪. একজন বন্ধুসুলভ শিক্ষক কখনোই ক্লাসে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে অপমান করার জন্য নির্লজ্জভাবে সমালোচনা করেন না। বরং তিনি সব সময় গঠনমূলক সমালোচনা করেন এবং ওই সমালোচনা থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিতে উৎসাহিত করেন। নেতিবাচকভাবে বা লজ্জা দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সমালোচনা করলে তরুণ শিক্ষার্থীরা আহত হতে পারে। ৫. একজন বন্ধু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এতটাই ফ্রি হয়ে যান যে, তারা কোথায় কেমন আচরণ করতে হয় সেটির বিবেচনা না করে তাদের অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করেন। ৬. একজন বন্ধুসুলভ শিক্ষক মানে একজন মহান শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করলে তারা শিক্ষকের কথায় অনুপ্রাণিত হয় এবং শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ে।
লেখকঃ এডুকেটর, প্রিন্সিপাল ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ স্মার্ট এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিসেন)
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
