অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন ।।
এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- শিক্ষার জন্য যে শিক্ষকের আমাদের প্রয়োজন তা আমরা চাই : শিক্ষকের ঘাটতি দূর করা বিশ্বব্যাপী অপরিহার্য।’ এই প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশে শিক্ষার জন্য যথোপযুক্ত শিক্ষকের ইঙ্গিত রয়েছে। দ্বিতীয় অংশে ‘শিক্ষকের ঘাটতি’ দ্বারা শিক্ষকদের জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা অথবা পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব এই দু’টিই আমরা বুঝে নিতে পারি। আমাদের দেশে যথোপযুক্ত শিক্ষক তৈরির জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা দূর হয়। আবার ‘শিক্ষকের ঘাটতি’ দ্বারা শিক্ষক সংখ্যার স্বল্পতা যদি বোঝানো হয় তাহলে তা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বেসরকারি সেক্টরে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ হলেও নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে।
শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কতগুলো ধাপকে শক্তিশালী করতে হবে। যেমন- শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন করতে হলে এর জন্য দরকার- ১. একটি শক্তিশালী জাতীয় শিক্ষানীতি; ২. বৈশি^ক অবস্থার সাথে তার সামঞ্জস্য করতে হবে; ৩. এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে; ৪. শিক্ষকদের সময় উপযোগী আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। এই চারটি বিষয়কে কার্যকর করার জন্য শিক্ষা শ্রমিকদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে।
চাকরি জাতীয়করণের জন্য অনেক ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে চাকরি জাতীয়করণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা যে ব্যবস্থায় জাতীয়করণকৃতদের বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় অর্থনৈতিক সুবিধা সরকারি কোষাগার থেকে অথবা সম্পূর্ণ সরকারি বিধানাদি অনুসরণ করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থেকে প্রতিষ্ঠান প্রদান করে। তাই জাতীয়করণ বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন- ১. পাবলিক প্রতিষ্ঠান; ২. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও ৩. সরকারি প্রতিষ্ঠান।
যেসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ রয়েছে সেগুলো পাবলিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে সরকার কখনো উপদেষ্টা আবার কখনো সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে কাজ করে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজস্ব রুলস ও রেগুলেশন রয়েছে, তাদের জন্য আলাদা অধ্যাদেশ রয়েছে এবং সেগুলোতে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না সেগুলো স্বায়ত্তশাসিত।
এখানে মূল ক্ষমতা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের। সরকার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মূল অর্থ জোগান দিয়ে থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠানের সব কিছু সরকার পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ করে সেগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠান চেনার উপায় হলো এগুলোতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ লিখা থাকবে এবং লোগো ব্যবহৃত হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকবে।
সরকারি যেকোনো আদেশ নিষেধ জারি করলে যেসব প্রতিষ্ঠান তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য থাকে, তা হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠানে পেনশন প্রথা চালু আছে। সরকারি কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো- ঢাকা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।
চাকরি জাতীয়করণের মাধ্যমে সমস্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যদি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়; তাহলে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগকৃত কলেজ শিক্ষকরা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন নন-ক্যাডারের মাধ্যমে নিয়োগকৃত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সাথে এমপিওভাবে নিয়োগকৃতদের একটি দ্বন্দ্ব লেগেই থাকবে। তাই এ অবস্থার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে যা সহজে অনুধাবন করা যায়; তাহলো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ আংশিক জাতীয়করকৃত। আমরা লক্ষ্য করি-
১. এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে শতভাগ মূল বেতন পেয়ে থাকেন।
২. তারা সরকার থেকে এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পেয়ে থাকেন।
৩. সরকার মোট ২০টি গ্রেডে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন প্রদান করে। এমপিও সেক্টরে বেতন গ্রেড-৪ থেকে ২০ পর্যন্ত অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক, প্রধান শিক্ষক, সহপ্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদান করা হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে উভয় অবস্থায় অর্থাৎ সরকারি ও এমপিওভুক্তিতে বিভিন্ন পদে গ্রেড-৪ থেকে ২০ পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা সমান।
৪. এমপিও সেক্টরে সরকার অবসর সুবিধা বাবদ ইনক্রিমেন্টসহ বেতন স্কেল যা হয় তার ৬ শতাংশ কেটে রাখে এবং কল্যাণ ট্রাস্ট বাবদ ৪ শতাংশ টাকা কেটে রাখে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্নভাবে পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন।
৫. প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো এমপিও সেক্টরের শিক্ষক কর্মচারীদের বার্ষিক ৫ শতাংশ বর্ধিত বেতন দিতে হয়।
৬. মূল্যস্ফীতির কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো এমপিও সেক্টরের শিক্ষক-কর্মচারীদের একই হারে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হয়।
৭. সরকারিদের নিয়োগ হয় বিসিএস ক্যাডার অথবা পাবলিক সার্ভিস কমিশন নন-ক্যাডার অথবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আর এমপিওভুক্তদের নিয়োগ হয় এনটিআরসির মাধ্যমে।
উল্লিখিত সাতটি বিষয় বিবেচনায় বলা যায়, এমপিও শিক্ষা সেক্টর জাতীয়করণকৃত। তবে গুণাগুণের বিবেচনায় এটিকে বলা হবে আংশিক জাতীয়করণকৃত। কারণ সরকার থেকে শতভাগ বেতন ছাড়াও এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া বাবদ প্রদান করা হয় এক হাজার টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা বাবদ প্রদান করা হয় ৫০০ টাকা; যেখানে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৪৫-৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া ও যৌক্তিক চিকিৎসা ভাতা পেয়ে থাকেন। এমপিওভুক্তদের সন্তানদের শিক্ষা খরচ, টিফিন ভাতা প্রভৃতি দেয়া হয় না কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের তা দেয়া হয়। সুতরাং এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি আংশিক জাতীয়করণকৃত। এমপিও সেক্টরগুলোতে সরকার এখন যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করে তার সাথে সামান্য বাড়ালে চাকরি জাতীয়করণ হয়ে যাবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাকে অর্থাৎ শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করার পথ অতি সহজ হয়েছে। ৫ শতাংশ বর্ধিত বেতন প্রদানের মাধ্যমে এই চাকরির মর্যাদা আগের চেয়ে বেড়েছে।
৫ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান জাতীয়করণের পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল। সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট হার থেকে বাড়িভাড়া যেখানে আমার প্রস্তাব ৫০ শতাংশ প্রদান করে, যৌক্তিক চিকিৎসা ভাতা প্রদান করে এবং অন্যান্য সুবিধাও যুগোপযোগী করে তোলে, তাহলে এই সেক্টরটি জাতীয়করণকৃত হবে। গ্রামের জীবনব্যবস্থায় খরচ কম বলে সেখানে কম হারে বাড়িভাড়া, শহরগুলোতে আরো বেশি এবং মহানগরগুলোতে সর্বোচ্চ হারে বাড়িভাড়া দেয়া যায়।
তবে এর একটি ভিন্ন নাম দিতে হবে। তাহলে দু’ধারার নিয়োগকৃতদের সাথে এদের কোনো দ্বন্দ্ব হবে না। এখানে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক পদ একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে সৃষ্টি করতে হবে। যেহেতু এখন পর্যন্ত এই সেক্টরটি আংশিক জাতীয়করণের মধ্যে আছে সেহেতু সুযোগ সুবিধা খানিকটা বৃদ্ধি করে একে জাতীয়করণ করা যায়। আর এই জাতীয়করণের নাম হবে Monthly Pay Order (MPO)। ফলে আমরা চার ধরনের জাতীয়করণের সন্ধান পাই-
১. পাবলিক প্রতিষ্ঠান;
২. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান; ৩. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও
৪. এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে নতুন ধারার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী না হয়ে একটি নতুন ধারার স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষার কারিগরে রূপান্তরিত হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষা বিশ্লেষক
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৫/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
