এইমাত্র পাওয়া
পূর্বধলা উপজেলার কাপাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন খান। ছবিঃ সংগৃহীত

মৃত ২ জনের স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ জালিয়াতি করেও বহাল প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক, নেত্রকোনাঃ জেলার পূর্বধলা উপজেলার কাপাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে  ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে এবং মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগের তদন্তে সত্যতা মিললেও এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. কপিল উদ্দিন খান।

জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কাপাশিয়া গ্রামের মরহুম ফজলুল হকের ছেলে মো. কামরুল হাসান গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জমি দাতা মো. ফজলুল হক এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে ১.২০ একর পৈত্রিক সম্পত্তিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কফিল উদ্দিন খানকে প্রধান শিক্ষক ও আরও ৬ জন শিক্ষক, ১ জন অফিস সহকারী ও ২ জন পিয়ন নিয়োগ প্রদান করেন। ১৯৯৬ সালে বিদ্যালয়টি মাউশি কর্তৃক নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং ১৯৯৯ সালে এমপিও ভূক্ত হয়।  ২০০৪ সালে প্রধান শিক্ষক তার স্ত্রী কানিজ উম্মে ফাতেমাকে কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়ম বহির্ভূতভাবে সহকারী শিক্ষক হতে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। কানিজ উম্মে ফাতেমা সহকারী শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগ করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করলেও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদটি এমপিও ভূক্ত না হওয়ায় তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতাদি উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। ২০০৯ সালে ফজলুল হক পুনরায় বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হন। ২০১১ সালে ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হলে নতুন কমিটি গঠন করার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আদালতে ১১৬/২০১১ মামলা দায়ের করেন। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্য ফজলুল হক মৃত্যুবরণ করেন। আদালতে মামলার কারণে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোন কমিটি ছিল না। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর পরই প্রধান শিক্ষক আদালতের মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন।

প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন খান ২০১৯ সালে  অনিয়মিত ও অখ্যাত পত্রিকায় (ব্যাক ডেটে) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে ডিজির প্রতিনিধির ডিমান্ড অর্ডার (ডি.ও) এর স্বাক্ষর জাল করে সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফজলুল হকের মৃত্যুর তিন মাস পর তাকে জীবিত উপস্থাপন করে ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত পর পর ৫টি সভা, স্বাক্ষাৎকার বোর্ড, নিয়োগ বোর্ডর সিদ্ধান্ত ও নিয়োগপত্র প্রদানের সভার রেজুলেশন দেখিয়ে এবং সকলের স্বাক্ষর জাল করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে লিটন মিয়া ও কৃষি বিষয়ক শিক্ষক হিসেবে মোস্তাক আহমেদকে নিয়োগ প্রদান করেন। প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন খান তার মৃত পিতা ফয়েজ উদ্দিন খানকে মৃত্যুর সাড়ে তিন বছর পর উক্ত কমিটির একজন সদস্য হিসেবে উপস্থিত দেখিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ফজলুল হকের ছেলে মো. কামরুল হাসান ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে জেলা প্রশাসক বারাবরে লিখিত অভিযোগে ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক কর্তৃক গঠিত তদন্ত দল সরেজমিনে তদন্ত করেন।

২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে তদন্তকারী কর্মকর্তা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মহিবুল্লাহ্, সহকারী প্রোগ্রামার আইসিটি মো. রফিকুল ইসলাম এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. রুহুল আলম স্বাক্ষরিত সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পাঠানো হয়। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের নিকট প্রেরণ করেন।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে,, কাপাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও অত্র বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মরহুম মোঃ ফজলুল হক ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর  মৃত্যু বরণ  করলেও রেজুলেশনে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ, ২৫ এপ্রিল এবং ২০ জুন তারিখে  এবং বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ সংক্রান্ত ফলাফল সীটে একই বছরের দুই জুনে কিভাবে স্বাক্ষর করেন তাঁর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি প্রধান শিক্ষক। তদন্তে প্রতিয়মান হয় রেজুলেশন এবং ফলাফল সীটের স্বাক্ষরগুলো মরহুম মোঃ ফজলুল হক এর নয়।

ঐ সূত্র বলছে, প্রধান শিক্ষক এর পিতা মরহুম মোঃ ফয়েজ উদ্দিন খান বিদ্যালয়ের একজন দাতা সদস্য ছিলেন যিনি মারা যান ২০১১ সালে। কিন্তু মৃত্যুর পরেও রেজুলেশনে  ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ, ২৫ এপ্রিল এবং ২০ জুন তারিখে  কিভাবে মরহুম মোঃ ফয়েজ উদ্দিন খান স্বাক্ষর করেন তা জানতে চাওয়া হয়। তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, রেজুলেশনে স্বাক্ষরগুলো মরহুম মোঃ ফয়েজ উদ্দিন খান এর নয়।

জানা গেছে,, আবার তৎকালীন বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ সংক্রান্ত তিনটি ফলাফল সীটেই দেখা যায় যে, ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন বাসুদেব চন্দ্র সাহা। বাসুদেব চন্দ্র সাহার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, ১৮/০৪/২০১২ খ্রি. তারিখে জয়হরী স্প্রাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা এর প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) ও ০২/০৬/২০১৫ খ্রি. তারিখে আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন না বিধায় নিয়োগ সংক্রান্ত ফলাফল সীটে স্বাক্ষর ও সিলমোহর ব্যবহারের বিষয়টি অবগত নন। অপর স্বাক্ষরিত মোঃ শফিকুল বারী, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, পূর্বধলা, নেত্রকোণা (বর্তমানে মদন, নেত্রকোণায় কর্মরত) এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি মুঠোফোনে জানান যে, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ায় তার স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার কারণে কাপাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে তার মনে পড়ছে না।

সূত্র মারফত জানা গেছে, তদন্তকারী দল সার্বিক মতামত জানিয়েছেন, অভিযোগকারী মোঃ কামরুল হাসান এর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাপাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আনিত অভিযোগসমূহ সত্য বলে তদন্ত কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসক তদন্ত প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠান। তবে এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে কোনো ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয় অভিযোগকারী বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মরহুম ফজলুল হকের ছেলে মো. কামরুল হাসান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, দুই দুই জন মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর জাল করে এবং বেক ডেটে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার মত অপরাধ করেও এখন পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে মাউশির মাধ্যমিক শাখার সহকারি পরিচালক দূর্গা রানী সিকদার জানান, তিনি সরকারি স্কুলটি দেখেন বেসরকারি মাধ্যমিক শাখায় যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এতদিনে তো এই ফাইল টা কার্যতালিকায় থাকার কথা। কেন এখনও হয়নি। আমি খোঁজ নিব। দ্রুত বিষয়টি দেখা হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৬/০৯/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.